২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

গম্ভীর চেহারার আড়ালে চঞ্চল স্বভাব, সুন্দরবনের সাদা-গলা মাছরাঙা

92a60b43f85056d29b6f9269c9641081-6ae33056c5326

সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য শুধু বাঘ, হরিণ ও কুমিরের আবাসস্থল নয়, নানা প্রজাতির পাখির বিচরণেও সমৃদ্ধ এই বন। নদী-খাল, কাদামাটির চর, ঘন ঝোপঝাড় আর গাছের ডালে ছড়িয়ে রয়েছে পাখিদের বিচিত্র জগৎ। কখনও নৌকার কাছ দিয়ে দ্রুত উড়ে যায় কোনো পাখি, কখনও আবার গাছের ডালে বসে সতর্ক চোখে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। সুন্দরবনের এমনই নজরকাড়া বাসিন্দা সাদা-গলা মাছরাঙা। ইংরেজিতে পাখিটি পরিচিত ‘কলার্ড কিংফিশার’ নামে।

সুন্দরবনে পাখি দেখতে গেলে কালো টুপিওয়ালা মাছরাঙার পাশাপাশি দেখা মিলতে পারে সাদা-গলা মাছরাঙারও। দুই প্রজাতিরই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তবে সাদা-গলা মাছরাঙার চলাফেরা ও আচরণ পাখিপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। নিজের চেনা এলাকায় পাখিটিকে বেশ সাবলীলভাবে বিচরণ করতে দেখা যায়। কখনও গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে যায়, কখনও খালপাড়ের ঝোপে গিয়ে বসে, আবার কখনও খোলা জায়গার ওপর দিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যায়। তার চলাফেরা দেখে মনে হয়, আশপাশের পরিবেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন তার পরিচিত।

সাদা-গলা মাছরাঙার চেহারায় রয়েছে এক ধরনের গাম্ভীর্য। স্থির দৃষ্টি আর নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে, পাখিটি গভীর মনোযোগে চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে নিচ্ছে। কিন্তু শান্ত এই অবয়বের আড়ালে রয়েছে বেশ চঞ্চল ও সতর্ক স্বভাব। সামান্য শব্দ শুনলে কিংবা আশপাশে কোনো নড়াচড়া টের পেলেই সে দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। কখনও তীক্ষ্ণ স্বরে ডাক দেয়, আবার কখনও এক মুহূর্তের মধ্যে উড়ে গিয়ে অন্য কোনো ডালে আশ্রয় নেয়। তাই দূর থেকে তাকে স্থির ও শান্ত মনে হলেও কাছ থেকে দেখলে তার ক্ষিপ্রতা এবং সতর্ক আচরণ সহজেই চোখে পড়ে।

নামে মাছরাঙা থাকলেও সাদা-গলা মাছরাঙার খাবারের তালিকা কেবল মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ ও শিকারের সুযোগ অনুযায়ী ছোট মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, ব্যাঙ, ছোট সরীসৃপ এবং বিভিন্ন ধরনের বড় পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে এই পাখি। কখনও ছোট ইঁদুরের মতো প্রাণীও তার খাদ্য হতে পারে। শিকারের সময় সে সাধারণত আশপাশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখে এবং উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করে। সুন্দরবনের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের শিকার খাওয়ার এই অভ্যাস তার টিকে থাকার ক্ষেত্রে সহায়ক।

সাদা-গলা মাছরাঙাকে স্বাভাবিক পরিবেশে দেখতে হলে পর্যবেক্ষকের ধৈর্য থাকা প্রয়োজন। নৌকায় বসে কিংবা খালের পাশে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নজর রাখলে পাখিটির স্বাভাবিক চলাফেরা দেখার সুযোগ তৈরি হয়। তবে পাখির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করা, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করা কিংবা তাকে লক্ষ্য করে কোনো কিছু ছুড়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে পাখিটি ভয় পেতে পারে এবং তার স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। দূরবিন ব্যবহার করলে কিংবা দূর থেকে ছবি তোলার উপযোগী ক্যামেরা থাকলে পাখিটির রং, ঠোঁটের আকৃতি ও বসে থাকার ভঙ্গি আরও ভালোভাবে দেখা যায়।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শুধু বিশাল বনভূমি, নদী কিংবা বড় বন্য প্রাণীদের উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অরণ্যের ছোট ছোট পাখির জীবনযাপনও এই পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। সাদা-গলা মাছরাঙা সেই বৈচিত্র্যেরই একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। তার গম্ভীর চেহারা, সতর্ক দৃষ্টি, তীক্ষ্ণ ডাক এবং দ্রুত উড়ে যাওয়ার দৃশ্য পাখিপ্রেমীদের কাছে বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

Advertisements

বনের নীরবতার মধ্যে হঠাৎ মাছরাঙার ডাক ভেসে আসা কিংবা সবুজ পাতার আড়াল থেকে তার দ্রুত উড়ে যাওয়ার দৃশ্য সুন্দরবন ভ্রমণে অন্য রকম অভিজ্ঞতা যোগ করে। যারা প্রকৃতি ও পাখি পর্যবেক্ষণ ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে সাদা-গলা মাছরাঙার এমন স্বল্প সময়ের উপস্থিতিও হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় মুহূর্ত।

Advertisements