২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বিজ্ঞান

নেক্রোফিলিয়া:মৃতদেহকে ঘিরে যৌন আকর্ষণ, কী বলছে মনোবিজ্ঞান?

নেক্রোফিলিয়ায়-আক্রান্ত-এক-ব্যক্তি

মৃত্যুর পর মানুষের দেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ কিংবা মৃতদেহের সঙ্গে যৌন আচরণের প্রবণতাকে বলা হয় ‘নেক্রোফিলিয়া’ (Necrophilia)। এটি যৌন আচরণের একটি বিরল ও গুরুতর অস্বাভাবিক প্রবণতা, যা মনোবিজ্ঞানে প্যারাফিলিয়ার আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের আচরণ মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, পরিবারের অনুভূতি এবং আইনগত অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে শুধু অস্বাভাবিক কোনো চিন্তা বা কল্পনা থাকলেই কাউকে মানসিক রোগে আক্রান্ত বলা যায় না; ব্যক্তির আচরণ, প্রবণতার প্রকৃতি ও অন্যান্য মানসিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হয়।

নেক্রোফিলিয়া কী?

‘নেক্রোফিলিয়া’ শব্দটি গ্রিক ভাষার দুটি শব্দ থেকে এসেছে। ‘নেক্রোস’ অর্থ মৃতদেহ এবং ‘ফিলিয়া’ অর্থ আকর্ষণ বা অনুরাগ। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি মৃত ব্যক্তির দেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহকে কেন্দ্র করে যৌন আচরণের প্রবণতাকে বোঝায়।

এটি সাধারণ যৌন আচরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৃত ব্যক্তি সম্মতি জানাতে বা কোনো আচরণের বিরোধিতা করতে পারেন না। তাই মৃতদেহের সঙ্গে যৌন আচরণ সম্মতি ও মানবিক মর্যাদার গুরুতর লঙ্ঘন। এ ধরনের কাজের আইনগত পরিণতি দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

কেন এমন আকর্ষণ তৈরি হতে পারে?

নেক্রোফিলিয়ার পেছনে একটিমাত্র কারণ রয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। বিভিন্ন গবেষণায় ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, ব্যক্তিত্ব, যৌন কল্পনা, সম্পর্কের অভিজ্ঞতা এবং নিয়ন্ত্রণ বা প্রত্যাখ্যানের ভয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এসব বিষয় সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না।

Advertisements

১৯৮৯ সালে রোসম্যান ও রেজনিকের (Rosman & Resnick) প্রকাশিত একটি গবেষণায় নেক্রোফিলিয়ার ১২২টি ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, বিশ্লেষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশে এমন একজন সঙ্গী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে আসে, যিনি প্রত্যাখ্যান করবেন না বা বাধা দেবেন না। গবেষকেরা এ ছাড়া একাকিত্ব, জীবিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অসুবিধা এবং ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়ও আলোচনা করেন।

তবে এই পরিসংখ্যানকে সব নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। গবেষণাটি মূলত শনাক্ত হওয়া ও নথিভুক্ত কিছু ঘটনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। ফলে এটি পুরো জনগোষ্ঠীর মানসিক বৈশিষ্ট্যের নির্ভুল চিত্র তুলে ধরে না।

নেক্রোফিলিয়ার ধরন

গবেষণাসাহিত্যে নেক্রোফিলিয়ার বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। প্রচলিত একটি শ্রেণিবিন্যাসে তিনটি ধরন বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

প্রথমত, নেক্রোফিলিক হোমিসাইড। এ ক্ষেত্রে মৃতদেহের সঙ্গে যৌন আচরণের উদ্দেশ্যে কাউকে হত্যা করার প্রবণতা বা ঘটনা বোঝানো হয়। এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধমূলক আচরণ। তবে সব নেক্রোফিলিয়ার ঘটনায় হত্যা জড়িত থাকে না।

দ্বিতীয়ত, নিয়মিত নেক্রোফিলিয়া। এ ধরনের ক্ষেত্রে মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহের সঙ্গে যৌন আচরণের প্রবণতা সরাসরি প্রকাশ পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মৃতদেহের সংস্পর্শে আসার সুযোগের বিষয়টিও বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার গবেষণায় উঠে এসেছে।

তৃতীয়ত, নেক্রোফিলিক ফ্যান্টাসি। এ ক্ষেত্রে মৃতদেহকে কেন্দ্র করে যৌন কল্পনা বা চিন্তা থাকতে পারে। তবে কোনো চিন্তা বা কল্পনা থাকা এবং বাস্তবে সে অনুযায়ী আচরণ করা এক বিষয় নয়। শুধু কল্পনার ভিত্তিতে কারও মানসিক রোগ নির্ণয় করা যায় না; তার মানসিক অবস্থা, কষ্টের মাত্রা, আচরণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, এই তিনটি ধরন নেক্রোফিলিয়া নিয়ে আলোচিত একটি শ্রেণিবিন্যাসের অংশ; এটি সব আধুনিক রোগনির্ণয় পদ্ধতিতে স্বীকৃত আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ নয়।

মৃতদেহের সংস্পর্শে আসার সুযোগ কেন আলোচনায় আসে?

কিছু অপরাধবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, নেক্রোফিলিক আচরণে জড়িত কিছু ব্যক্তি এমন পেশা বা পরিবেশে কাজ করেছেন, যেখানে মৃতদেহের সংস্পর্শে আসার সুযোগ রয়েছে। যেমন—মর্গ, হাসপাতাল বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান। তবে এসব পেশায় কাজ করা মানেই কারও মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা রয়েছে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। অধিকাংশ কর্মী সম্পূর্ণ পেশাদারত্ব ও মানবিক মর্যাদা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেন।

এখানে মূল বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির পেশা নয়; বরং তার আচরণ, উদ্দেশ্য এবং মৃত ব্যক্তির দেহের প্রতি সম্মান বজায় রাখার বিষয়টি।

এটি কি মানসিক রোগ?

নেক্রোফিলিয়াকে সাধারণত অস্বাভাবিক যৌন আগ্রহ বা প্যারাফিলিয়ার আলোচনায় বিবেচনা করা হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—অস্বাভাবিক যৌন আগ্রহ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ণীত মানসিক ব্যাধি এক বিষয় নয়।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডারস (DSM-5-TR) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস (ICD-11) মানসিক ও আচরণগত সমস্যার মূল্যায়নের জন্য পৃথক মানদণ্ড ব্যবহার করে। নেক্রোফিলিয়াকে এসব নির্দেশিকায় কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। একে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা সঠিক নয়।

কোনো ব্যক্তির এমন প্রবণতা যদি তাঁকে তীব্র মানসিক কষ্টে ফেলে, দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে অথবা অন্যের প্রতি ক্ষতিকর আচরণের ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

সামাজিক ও আইনগত দিক

নেক্রোফিলিয়া শুধু মনোবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, পরিবারের শোক, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইনও জড়িত। মৃত ব্যক্তি সম্মতি দিতে অক্ষম হওয়ায় মৃতদেহের সঙ্গে যৌন আচরণকে অনেক দেশে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের ওপর নির্ভর করে।

এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে হাসপাতাল, মর্গ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাব্যবস্থা, দায়িত্বশীল তদারকি এবং মৃতদেহের প্রতি যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অস্বাভাবিক যৌন চিন্তা নিয়ে কেউ উদ্বিগ্ন হলে তাঁকে অপমান বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

নেক্রোফিলিয়া একটি বিরল ও জটিল বিষয়, যার পেছনে একাধিক মানসিক ও আচরণগত উপাদান থাকতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে বৈজ্ঞানিক তথ্য, ব্যক্তিগত চিন্তা ও বাস্তব আচরণের পার্থক্য এবং মৃত ব্যক্তির মর্যাদা—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Advertisements