২১ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ৫ কার্তিক ১৪৩৩
বিজ্ঞান

মাত্র ১৯ বছরেই অ্যালঝেইমার্স, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন রহস্য

IMG_6467

স্মৃতিভ্রংশ বা অ্যালঝেইমার্স রোগের কথা উঠলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো বয়স্ক মানুষের ছবি। কিন্তু মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ২০২২ সালে চীনের এক তরুণের শরীরে অ্যালঝেইমার্স শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার পরিবারে এই রোগের ইতিহাস ছিল না, এমনকি জিনগত পরীক্ষাতেও পরিচিত কোনো ক্ষতিকর পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেননি গবেষকেরা।

তরুণটির সমস্যার শুরু হয়েছিল ১৭ বছর বয়সে। তখন থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে এবং পড়া মনে রাখতে অসুবিধা হচ্ছিল তার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আগের দিনের ঘটনা মনে রাখা কিংবা নিজের জিনিসপত্র কোথায় রেখেছে, তা মনে করতেও সমস্যায় পড়তে শুরু করে সে। একপর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

চীনের বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল মেডিকেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা তার শারীরিক ও স্নায়বিক অবস্থা পরীক্ষা করে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষণ পান। মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা যায়, স্মৃতি গঠনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হিপোক্যাম্পাসের আকার ছোট হয়ে গেছে। পাশাপাশি সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুকে ঘিরে থাকা তরল পরীক্ষা করেও অ্যালঝেইমার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়।

মেমোরি ক্লিনিকে করা পরীক্ষায় তরুণটির স্মৃতিশক্তিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ধরা পড়ে। গবেষণায় তার স্মৃতিসংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষার ফল সমবয়সীদের তুলনায় অনেক কম ছিল বলে জানানো হয়। এ ছাড়া সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডে টাউ প্রোটিনের মাত্রাও বেশি পাওয়া যায়, যা অ্যালঝেইমার্স রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক বৈশিষ্ট্য।

সাধারণত অল্প বয়সে অ্যালঝেইমার্স দেখা দিলে তার পেছনে জিনগত কারণ থাকতে পারে। এর আগে ২১ বছর বয়সী এক রোগীর ক্ষেত্রে PSEN1 জিনের পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের ক্ষেত্রে পরিচিত কোনো ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন খুঁজে পাননি গবেষকেরা। তার পরিবারেও অ্যালঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার ইতিহাস ছিল না। মাথায় আঘাত কিংবা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে পারে, এমন কোনো সংক্রমণের ইতিহাসও পাওয়া যায়নি।

অ্যালঝেইমার্স রোগে সাধারণত মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিনের জমাট এবং টাউ প্রোটিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্ষতি করতে পারে এবং স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে। তবে এত কম বয়সে, পরিচিত কোনো জিনগত কারণ ছাড়াই রোগটি দেখা দেওয়ার পেছনে কী কাজ করেছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

Advertisements

জার্নাল অব অ্যালঝেইমার্স ডিজিজ-এ প্রকাশিত এই ঘটনা রোগটির কারণ ও বিকাশ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে একটি বিরল ঘটনা থেকে তরুণদের মধ্যে অ্যালঝেইমার্সের ঝুঁকি বাড়ছে কিংবা এটি ভবিষ্যতের কোনো বড় সংকেত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের কাছে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে অ্যালঝেইমার্সের লক্ষণ সব সময় বার্ধক্যেই শুরু হবে, এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। অল্প বয়সে স্মৃতিশক্তির সমস্যা দেখা দিলে তার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমবর্ধমান স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যাকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

১৯ বছর বয়সী এই তরুণের ঘটনা অ্যালঝেইমার্স গবেষণায় এক বিরল অধ্যায়। রোগটির পেছনে থাকা জৈবিক ও জিনগত প্রক্রিয়া আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসার নতুন পথ তৈরি হতে পারে।

Advertisements