মাতৃত্বকালীন নীতিমালা নেই বিসিবিতে, অনিশ্চয়তায় নারী ক্রিকেটাররা

নারী ক্রিকেটারদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সন্তান জন্মের পর মাঠে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য এসব বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ফলে মাতৃত্বের সময় বেতন-ভাতা, চুক্তির নিশ্চয়তা ও পুনরায় ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন খেলোয়াড়েরা।

গত ২২ জুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) নারী ক্রিকেটারদের সন্তান জন্মের পর মাঠে ফেরার জন্য একটি নির্দেশিকা চালু করে। এতে শারীরিক সুস্থতা যাচাই, চিকিৎসকের পরামর্শ, পুনর্বাসন, ফিটনেস উন্নয়ন এবং ধাপে ধাপে অনুশীলনে ফেরার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্দেশিকাটির উদ্দেশ্য হলো, মাতৃত্বের পর একজন ক্রিকেটার যেন নিরাপদ ও পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পারেন। তবে এই নির্দেশিকা সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ডকে নিজস্ব নীতিমালা তৈরিতে সহায়তা করলেও মাতৃত্বকালীন সময়ে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
এ ক্ষেত্রে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। তাদের চুক্তিবদ্ধ নারী ক্রিকেটারদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি সন্তান জন্মের পর খেলায় ফেরার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ২০২১ সালে ‘প্যারেন্টাল সাপোর্ট পলিসি’ চালু করে। এর পরের বছর সন্তান জন্মের প্রায় ছয় মাসের মাথায় শিশুসন্তান ও একজন সহায়তাকারীকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দেন দেশটির নারী ক্রিকেটার বিসমাহ মারুফ।

বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ফাতেমা তুজ জোহরা, যিনি অস্ট্রেলিয়া ও চীনে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে কাতার নারী ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ, তার অভিজ্ঞতায়ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য উঠে এসেছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় মাতৃত্বকালীন সময়ে বেতন দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা ও ফিটনেস মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব সহায়তা একজন ক্রিকেটারকে সন্তান জন্মের পর পেশাগত জীবনে ফেরার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটার শুধু নিজেদের নয়, পরিবারেরও আর্থিক দায়িত্ব বহন করেন। ফলে গর্ভধারণের কারণে চুক্তি বা আয় হারানোর আশঙ্কা তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনেক নারী ক্রিকেটারকে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত ভবিষ্যতের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
এদিকে বিসিবির নারী বিভাগের প্রধান রফিকুল ইসলাম বাবু জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো ক্রিকেটার অন্তঃসত্ত্বা হলে বা মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইলে বোর্ড আইসিসির নির্দেশিকা অনুসরণ করবে। জাতীয় দলের সাবেক পেসার সুরাইয়া আজমিনের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও তিনি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বোর্ডে এখনো আনুষ্ঠানিক মাতৃত্বকালীন নীতিমালা নেই। বর্তমানে এ ধরনের বিষয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজনীয় নীতিমালাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে শুধু আশ্বাস নয়, নারী ক্রিকেটারদের জন্য কার্যকর ও লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ, ছুটির সময় বেতন-ভাতা, চুক্তির নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা এবং সন্তান জন্মের পর অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় ফেরার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। এতে ক্রিকেটাররা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারবেন এবং মাতৃত্বের কারণে পেশাগত অনিশ্চয়তায় পড়ার ঝুঁকি কমবে।
বিশ্বের বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ড যখন মাতৃত্বের পরও নারী খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার অব্যাহত রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিসিবির প্রতিশ্রুতি বাস্তব নীতিমালায় রূপ নিলে নারী ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে এবং মাতৃত্বের পর মাঠে ফেরার পথও সহজ হতে পারে।
সূত্র: ডেইলি স্টার



