২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
নারী

৬৩ বছরের আকাশজীবন শেষে বিদায়, ক্যারলের শেষ ফ্লাইট ঘিরে বিশেষ আয়োজন

prothomalo-bangla_2026-10-27_22n3hfi5_WhatsApp-Image-2026-10-27-at-7.38.08-PM

দীর্ঘ ৬৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে আকাশপথে যাত্রীসেবা দেওয়ার পর অবসরে গেলেন ক্যারল ফেয়ার। বর্তমানে তার বয়স ৮৩ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে পরিচিত ক্যারলের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান ঘটেছে গত ২৬ অক্টোবর। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, তার শেষ ফ্লাইটটি অবতরণ করে ২৭ অক্টোবর রাতে।

সংগৃহীত

ক্যারল ফেয়ারের শেষ কর্মদিবস ছিল স্মরণীয়। যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের শার্লটগামী আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৩৩-এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্থানীয় সময় ২৬ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে বিমানটি শার্লট বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এর মধ্য দিয়ে ছয় দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনের ইতি টানেন এই ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট।

ক্যারলকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিমানটি অবতরণের পর পানি ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ব্যবস্থা ছিল। সাধারণত কোনো পাইলটের শেষ ফ্লাইট উপলক্ষে এ ধরনের আয়োজন করা হয়। তবে একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের বিদায়েও এমন সম্মান প্রদর্শন ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা।

শেষ ফ্লাইটের জন্য লন্ডন-শার্লট রুটটি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন ক্যারল। এর পেছনে রয়েছে তার কর্মজীবনের শুরুর দিকের একটি স্মৃতি। ১৯৮৭ সালের ১৫ জুন পিডমন্ট এয়ারলাইনসের শার্লট-লন্ডন রুটের প্রথম ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই রুট দিয়েই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন ক্যারল।

১৯৬৩ সালে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের জনসন সিটিতে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর চাকরির খোঁজে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পিডমন্ট এয়ারলাইনসের একজন স্টেশন ম্যানেজারের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই বিমানসেবিকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান।

তবে ক্যারলের কর্মজীবনের শুরুটা খুব সহজ ছিল না। প্রথম দিকে আমেরিকান এয়ারলাইনসে চাকরির জন্য আবেদন করলেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ান মাইল অ্যাট আ টাইম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় তাকে জানানো হয়েছিল, তিনি আমেরিকান এয়ারলাইনসে কাজ করার উপযুক্ত নন। দীর্ঘদিন পর সেই এয়ারলাইনসেরই সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে অবসরে গেলেন তিনি।

Advertisements

কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পিডমন্ট এয়ারলাইনস, ইউএস এয়ারওয়েজ এবং সবশেষে আমেরিকান এয়ারলাইনসে কাজ করেছেন ক্যারল। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তন ও একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন এগিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে তিনি বিমান চলাচল খাতের একজন অভিজ্ঞ কর্মী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।

আমেরিকান এয়ারলাইনসে প্রায় ৩০ হাজার ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট কাজ করেন। তাদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে ছিলেন ক্যারল ফেয়ার। তবে তার চেয়েও জ্যেষ্ঠ দুজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রয়েছেন, যারা বর্তমানে আর ফ্লাইট পরিচালনা করেন না। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে না গেলেও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। সে কারণেই ক্যারলকে এয়ারলাইনসটির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের পেশায় জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাজের সময়সূচি, ফ্লাইটের রুট এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ। দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছানোকে নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন ক্যারল।

নিজের সাফল্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রথম স্থানে পৌঁছানো তার জন্য বিশেষ গর্বের বিষয়। তার ভাষায়, ‘এর চেয়ে ওপরে ওঠার আর কোনো জায়গা নেই।’

ক্যারলের দীর্ঘ কর্মজীবন এমন এক সময়ের সাক্ষ্য বহন করে, যখন নারী ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের কর্মপরিবেশ বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ছিল। ১৯৬৩ সালে তিনি যখন এই পেশায় যোগ দেন, তখন বিভিন্ন এয়ারলাইনসে নারী কর্মীদের বিয়ে করার ওপর বিধিনিষেধ, চেহারা ও শারীরিক গঠন নিয়ে কঠোর শর্ত এবং নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে যাওয়ার নিয়ম প্রচলিত ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মাত্র ৩২ বছর বয়সেই চাকরি ছাড়তে হতো।

এসব বৈষম্যমূলক নিয়মের বিরুদ্ধে নারী ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করতে হয়েছে। ওজনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ, বিয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা এবং বয়সের ভিত্তিতে কর্মজীবন সীমিত করে দেওয়ার মতো নিয়মের বিরুদ্ধে আগের প্রজন্মের কর্মীদের সংগ্রামকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ক্যারল।

তার নিজের কর্মজীবনও এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যে পেশায় একসময় নারীদের চাকরির মেয়াদ কঠোরভাবে সীমিত করা হতো, সেখানে তিনি ৬৩ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু নিজের পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দেননি, বরং বিমান চলাচল খাতে নারীদের কর্মজীবনের পরিবর্তনের ইতিহাসেরও অংশ হয়ে উঠেছেন।

তবে ৮০ বছরের বেশি বয়সে অবসরে যাওয়া ক্যারলই প্রথম ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট নন। এর আগে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের রন আকানাও ২০১২ সালে ৮৩ বছর বয়সে অবসরে গিয়েছিলেন।

ক্যারল ফেয়ারের অবসর তাই কেবল একজন অভিজ্ঞ কর্মীর কর্মজীবনের সমাপ্তি নয়; এটি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিমান চলাচল খাতে তার অবদান, পেশাগত নিষ্ঠা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া কর্মপরিবেশেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।

Advertisements