১২ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

ভয় পেলেই শরীর গরম, এমনকি জ্বরও! মনের দুশ্চিন্তায় শরীরে কী ঘটে?

WhatsApp Image 2026-10-12 at 8.28.06 PM

কোনো দুঃসংবাদ শোনার পর, হঠাৎ ভয় পেলে কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অনেকের শরীর গরম হয়ে ওঠে। কারও বুক ধড়ফড় করে, হাত-পা কাঁপে, ঘাম হয়; আবার কারও মনে হয়, শরীরে জ্বর এসেছে। এমনকি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মানসিক চাপের সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রাও সামান্য বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু মনের ভয় কীভাবে শরীরের ওপর এমন প্রভাব ফেলে? এটি কি সত্যিই জ্বর, নাকি উদ্বেগের কারণে তৈরি হওয়া শারীরিক অনুভূতি?


ভয় পেলে শরীরে কী ঘটে?

ভয় মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কোনো পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে হলে মস্তিষ্ক শরীরকে সতর্ক করে দেয়। তখন স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে পারে। এর ফলে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে, পেশিতে টান তৈরি হয় এবং ঘাম হতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

এই পরিবর্তনগুলো শরীরকে বিপদের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু একই সঙ্গে কারও কারও শরীরে গরম লাগা, মুখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা কাঁপুনির মতো অনুভূতিও দেখা দেয়। ফলে অনেকেই মনে করেন, তাঁদের জ্বর এসেছে।

দুশ্চিন্তা থেকে কি সত্যিই জ্বর হতে পারে?

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা তীব্র উদ্বেগের সঙ্গে কিছু মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে ‘সাইকোজেনিক ফিভার’ বা মানসিক চাপজনিত জ্বর বলা হয়। একে ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড হাইপারথার্মিয়া’ নামেও উল্লেখ করা হয়।

Advertisements

এ ক্ষেত্রে মানসিক চাপ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। কারও তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে, আবার কারও শরীর গরম লাগলেও থার্মোমিটারে জ্বর ধরা পড়ে না। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মানসিক চাপজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর সংক্রমণের কারণে হওয়া জ্বর এক বিষয় নয়। শরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় সাধারণত জ্বর আসে। অন্যদিকে, উদ্বেগের সময় শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের পেছনে মানসিক চাপ ও স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা থাকতে পারে।

শরীর গরম লাগলেই কি জ্বর?

অনেক সময় ভয় বা দুশ্চিন্তার মধ্যে শরীর গরম লাগা, মাথা ভারী হওয়া, বুক ধড়ফড় করা কিংবা দুর্বল বোধ করার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু এসব উপসর্গ থাকলেই প্রকৃত জ্বর হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপলে বিষয়টি বোঝা সহজ হয়। সাধারণভাবে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রাকে জ্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তাপমাত্রা মাপার পদ্ধতি ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর ফলাফলে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।

বারবার তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কিংবা জ্বরের সঙ্গে কাশি, গলাব্যথা, শরীরব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে শুধু দুশ্চিন্তাকে দায়ী করা উচিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা দরকার।

ভয় ও দুশ্চিন্তা সামলাবেন কীভাবে?

দুশ্চিন্তার সময় প্রথমেই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। আরামদায়ক জায়গায় বসে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া উপকারী হতে পারে। নিয়মিত ঘুম, পরিমিত শারীরিক ব্যায়াম এবং মানসিক চাপের কারণ চিহ্নিত করাও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। যদি ভয়, দুশ্চিন্তা বা আতঙ্কের অনুভূতি বারবার ফিরে আসে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তবে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভ্রান্তি বা তীব্র মাথাব্যথার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

মনের সঙ্গে শরীরের গভীর সম্পর্ক

মানুষের মন ও শরীর আলাদা কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মানসিক চাপ যেমন ঘুম, ক্ষুধা ও হৃদস্পন্দনে প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি কিছু মানুষের শরীরের তাপমাত্রাতেও পরিবর্তন আনতে পারে। তাই ভয় বা দুশ্চিন্তার সময় শরীরে অস্বস্তি দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি উপসর্গকে গুরুতর রোগ ভেবেও আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়।

শরীরের সংকেত বুঝতে শেখা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Advertisements