বাঘের গায়ে ডোরাকাটা দাগ কেন, এর পেছনে আছে যে রহস্য

বাঘের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য তার গায়ের কালো ডোরাকাটা দাগ। কমলা রঙের শরীরে কালো ডোরার এই নকশা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বন্য পরিবেশে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিশেষ করে শিকারের সময় চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে এবং শিকারের চোখ এড়িয়ে চলতে বাঘকে সাহায্য করে এই ডোরাকাটা দাগ।
বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ইন্দ্রজিৎ ঘোরপাড়ের মতে, বাঘের শরীরের ওপর লম্বালম্বি ডোরাগুলো তার দেহের বাইরের আকৃতি আড়াল করতে সাহায্য করে। ফলে বন, লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে চলাফেরার সময় বাঘকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিকারের কাছে নিঃশব্দে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য বাঘকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
সবুজের মধ্যে কমলা বাঘ কীভাবে লুকিয়ে থাকে?
মানুষের চোখে কমলা রঙের শরীরে কালো ডোরাকাটা বাঘকে সবুজ বনভূমির মধ্যে সহজেই চোখে পড়ার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু বাঘের শিকার হরিণসহ অনেক তৃণভোজী প্রাণী রং দেখে পৃথিবীকে মানুষের মতো করে উপলব্ধি করে না। ঘোরপাড়ে জানান, এসব প্রাণীর অনেকের চোখে দুই ধরনের রং শনাক্তকারী কোষ রয়েছে। ফলে লাল ও সবুজ রঙের পার্থক্য বুঝতে তাদের অসুবিধা হয়।
এ কারণে সবুজ গাছপালার মধ্যে কমলা রঙের বাঘকে মানুষের চোখে যতটা স্পষ্ট মনে হয়, শিকার প্রাণীর কাছে তা ততটা স্পষ্ট নাও হতে পারে। বাঘের গায়ের রং ও ডোরার সমন্বয় তাকে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া বনভূমিতে আলো-ছায়ার পরিবর্তনও বাঘের ছদ্মবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছের ফাঁক দিয়ে আসা আলো, ছায়া এবং গাছপালার বিভিন্ন নকশার মধ্যে বাঘের ডোরাগুলো তার শরীরের আকৃতি ভেঙে দেয়। ফলে আংশিকভাবে আড়ালে থাকা বাঘকে শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে এই সুবিধা কাজে লাগায় বাঘ।
প্রতিটি বাঘের ডোরার নকশা আলাদা
মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন একেকজনের আলাদা, তেমনি প্রতিটি বাঘের গায়ের ডোরার নকশাও স্বতন্ত্র। ডোরার বিন্যাস, প্রস্থ ও ঘনত্বে একেকটি বাঘের সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য থাকে। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলোকচিত্রের মাধ্যমে গবেষকেরা নির্দিষ্ট বাঘকে শনাক্ত করতে এবং তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
আবাসস্থলভেদে বাঘের চারপাশের পরিবেশও আলাদা। ঘন বনে বসবাসকারী বাঘকে ঘন গাছপালা ও আলো-ছায়ার মধ্যে চলাফেরা করতে হয়। অন্যদিকে, ভারতের রণথম্ভোরের ঝোপঝাড়পূর্ণ বনাঞ্চলে বাঘের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনেও আলো-ছায়া ও গাছপালার ধরন আলাদা।
তবে কোনো একটি বাঘ যে পরিবেশে বাস করে, তার সঙ্গে মিল রেখেই সরাসরি তার ডোরার নকশা তৈরি হয়—বিষয়টি এমন নয়। মূলত জিনগত বৈশিষ্ট্য ডোরার নকশা নির্ধারণ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে এসব বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে।
জন্ম থেকেই থাকে ডোরাকাটা দাগ
বাঘের শাবক জন্মের পর থেকেই গায়ে ডোরাকাটা দাগ নিয়ে আসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় দাগগুলোর চেহারায় পরিবর্তন দেখা গেলেও স্বতন্ত্র নকশাটি বজায় থাকে।
বাঘের ডোরাকাটা দাগ নিয়ে আরও একটি মজার তথ্য হলো, এই নকশা শুধু তার লোমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাঘের ত্বকেও একই ধরনের রঞ্জক বিন্যাস দেখা যায়। অর্থাৎ, বাঘের শরীরের লোম সরিয়ে ফেললেও ত্বকে ডোরাকাটা নকশা দৃশ্যমান থাকবে।
সব মিলিয়ে বাঘের ডোরাকাটা দাগ কেবল তার সৌন্দর্যের অংশ নয়; বরং শিকার ধরতে, প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেকে আড়াল করতে এবং গবেষকদের কাছে আলাদাভাবে শনাক্ত হতে সাহায্য করে এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।



