১৫ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বিনোদন

৭৫ বছর পরও কেন এত জনপ্রিয় ‘আই লাভ লুসি’

IMG_6220

১৯৫১ সালের ১৫ অক্টোবর মার্কিন টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করেছিল জনপ্রিয় সিটকম ‘আই লাভ লুসি’। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৭৫ বছর। অথচ চকলেট কারখানায় কাজ করতে গিয়ে বিপাকে পড়া লুসির কাণ্ড কিংবা স্বামীর অনুষ্ঠানে জায়গা করে নিতে তার বিচিত্র সব পরিকল্পনা আজও দর্শককে হাসায়। শুধু হাসির খোরাক জোগানো নয়, টেলিভিশনের নির্মাণশৈলী ও ব্যবসায়িক ধারণা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সিরিজটি।

সিরিজটির সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি ‘জব সুইচিং’ পর্বের চকলেট কারখানার ঘটনা। চলন্ত বেল্টে দ্রুতগতিতে আসতে থাকা চকলেট মোড়কে ভরার দায়িত্ব পান দুই বান্ধবী। প্রথমে সব ঠিক থাকলেও গতি বেড়ে গেলে কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে থাকেন তাঁরা। একপর্যায়ে চকলেট মুখে পুরে ও পোশাকের ভেতর লুকিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। লুসিল বল ও ভিভিয়ান ভ্যান্সের মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি এবং ধরা পড়ার ভয় মিলিয়ে দৃশ্যটি পরিণত হয় টেলিভিশন কমেডির অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তে।

১৯৫১ সালের এই দিনে সিবিএস চ্যানেলে প্রচার শুরু হয়েছিল সিরিজটির। সাদা-কালো পর্দায় একটি দম্পতির সংসার, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিপত্তি নিয়ে তৈরি এই অনুষ্ঠান অল্প সময়েই দর্শকের মন জয় করে। পর্দায় লুসি রিকার্ডো চরিত্রে অভিনয় করেন লুসিল বল। তাঁর স্বামী রিকি রিকার্ডোর ভূমিকায় ছিলেন বাস্তব জীবনের স্বামী, কিউবান বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ডলিডার দেশি আর্নাজ।

নিউইয়র্কে বসবাসকারী রিকি একটি নাইট ক্লাবের অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, স্ত্রী লুসির স্বপ্ন বিনোদনজগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করা। স্বামীর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কিংবা নিজের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বারবার নানা পরিকল্পনা করেন তিনি। আর সেই পরিকল্পনাগুলো থেকেই জন্ম নেয় হাস্যরসের।

লুসির প্রতিবেশী ও বন্ধু এথেল এবং ফ্রেড মার্টজের চরিত্রে অভিনয় করেন ভিভিয়ান ভ্যান্স ও উইলিয়াম ফ্রলি। লুসির উদ্যম, রিকির আপত্তি এবং দুই বন্ধুর সঙ্গে খুনসুটিতে প্রতিটি পর্বে তৈরি হতো নতুন পরিস্থিতি। চারটি চরিত্রের সম্পর্ক ও পারস্পরিক রসায়নই সিরিজটিকে দীর্ঘদিন দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় করে রেখেছিল।

লুসিল বলের টেলিভিশনযাত্রার পেছনেও ছিল একটি জনপ্রিয় বেতার অনুষ্ঠান। তিনি আগে সিবিএসের ‘মাই ফেবারিট হাজব্যান্ড’ অনুষ্ঠানে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানকে টেলিভিশনে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই ‘আই লাভ লুসি’র সূত্রপাত। তবে বাস্তব জীবনের স্বামী দেশি আর্নাজকে পর্দার স্বামী হিসেবে নেওয়ার বিষয়ে শুরুতে আপত্তি ছিল সিবিএস কর্তৃপক্ষের। কিউবায় জন্ম নেওয়া একজন শিল্পীকে সাধারণ মার্কিন স্বামীর চরিত্রে দর্শক গ্রহণ করবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল তাঁদের। শেষ পর্যন্ত মঞ্চে একসঙ্গে অনুষ্ঠান করে দর্শকের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন বল ও আর্নাজ।

Advertisements

টেলিভিশন নির্মাণে নতুন দিগন্ত

‘আই লাভ লুসি’র সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল এর নির্মাণপদ্ধতি। বল ও আর্নাজ চেয়েছিলেন, স্টুডিওতে দর্শকের সামনে অভিনয় করে তা উন্নত মানের ফিল্মে ধারণ করা হবে। এতে একদিকে যেমন মঞ্চে অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় থাকবে, অন্যদিকে পর্বগুলোও ভালো মানে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

সিরিজটির দৃশ্য ধারণে একসঙ্গে তিনটি ৩৫ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো। চিত্রগ্রাহক কার্ল ফ্রয়েন্ড এমনভাবে আলোর ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে অভিনয়ের সময় বারবার আলো পরিবর্তন করতে না হয়। এতে শিল্পীদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, পারস্পরিক কথোপকথন এবং স্টুডিওতে উপস্থিত দর্শকের হাসি সহজেই ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল।

একাধিক ক্যামেরা ব্যবহারের ধারণা আগে থেকেই থাকলেও দর্শকের সামনে অভিনয়, ফিল্মে ধারণ এবং তিন ক্যামেরার কার্যকর সমন্বয় ‘আই লাভ লুসি’কে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে যায়। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতি প্রতিষ্ঠায় কার্ল ফ্রয়েন্ড ও সিরিজটির প্রথম পরিচালক মার্ক ড্যানিয়েলস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে স্টুডিওতে দর্শকের উপস্থিতিতে নির্মিত সিটকমের ক্ষেত্রে এই কৌশল একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়।

লুসিল বলের অভিনয়েই প্রাণ পেয়েছিল লুসি

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি সিরিজটির সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন লুসিল বল। সিনেমায় দীর্ঘদিন কাজ করলেও লুসি রিকার্ডো চরিত্রটি তাঁকে নিজের অভিনয়প্রতিভা প্রকাশের অনন্য সুযোগ করে দেয়। বেসুরো গান গাওয়া থেকে শুরু করে স্বামীর সঙ্গে নিজেকে হাতকড়ায় আটকে ফেলা—বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে তাঁর দ্বিধা ছিল না।

লুসির আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনার পরিণতির মধ্যকার ব্যবধান থেকেই মূলত হাসির জন্ম হতো। দর্শক বুঝতে পারতেন, তাঁর পরিকল্পনা বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু লুসি তখনো নিজের সিদ্ধান্তে অটল। কখন মুখভঙ্গি বদলাতে হবে, কোথায় থামতে হবে কিংবা কীভাবে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে হবে, তা অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলতেন বল।

তবে তাঁর অভিনয়ের পেছনে ছিল শক্তিশালী চিত্রনাট্য। জেস ওপেনহাইমার, ম্যাডেলিন পিউ ও বব ক্যারল জুনিয়র বেতার অনুষ্ঠান থেকে টেলিভিশনেও কাজ চালিয়ে যান। টেলিভিশন একাডেমির একটি স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধে পরিচালক উইলিয়াম অ্যাশার জানিয়েছেন, কোনো কৌতুক চরিত্রের স্বভাবের সঙ্গে মানানসই না হলে লেখকেরা সেটি চিত্রনাট্যে রাখতেন না। ফলে লুসির কর্মকাণ্ড যতই অদ্ভুত হোক, দর্শকের কাছে তাঁর আচরণ বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো।

বাস্তবের মাতৃত্ব উঠে আসে পর্দায়

১৯৫২ সালে লুসিল বল অন্তঃসত্ত্বা হলে সিরিজটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তখন চিত্রনাট্যকার জেস ওপেনহাইমার প্রস্তাব দেন, বলের বাস্তব জীবনের এই পরিবর্তনকে গল্পের অংশ করা যেতে পারে। শুরুতে সিবিএস ও অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের কর্তারা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান। তবে শেষ পর্যন্ত পর্দার লুসির জীবনেও মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়।

১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রচারিত হয় ‘লুসি গোজ টু দ্য হসপিটাল’ পর্বটি। একই দিনে বাস্তব জীবনে পুত্রসন্তান দেশি আর্নাজ জুনিয়রের জন্ম দেন লুসিল বল। টেলিভিশন একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, পর্দায় লুসির সন্তান জন্মের ঘটনা দেখেছিলেন প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ দর্শক। একটি কাল্পনিক চরিত্রের জীবনের ঘটনা যে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, পর্বটি তার বড় উদাহরণ।

শেষ হওয়ার পরও থামেনি জনপ্রিয়তা

জনপ্রিয়তার দিক থেকেও ‘আই লাভ লুসি’ ছিল ব্যতিক্রমী। ছয় মৌসুমের চারটিতেই নিলসেন রেটিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করে সিরিজটি। শীর্ষে থাকা অবস্থায় মূল সম্প্রচার শেষ করা প্রথম টেলিভিশন সিরিজ হিসেবেও এটি বিশেষ স্বীকৃতি পায়।

নিয়মিত আধঘণ্টার সিরিজটির শেষ পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৫৭ সালের ৬ মে। এরপর একই চরিত্রগুলোকে নিয়ে তৈরি করা হয় ১৩টি এক ঘণ্টার বিশেষ অনুষ্ঠান। ১৯৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৬০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সেগুলো প্রচারিত হয়।

সিরিজটির দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ফিল্মে ধারণ করার সিদ্ধান্তের। উন্নত মানে সংরক্ষিত পর্বগুলো পরবর্তী সময়ে বারবার প্রচার করা সম্ভব হয়েছিল। পাশাপাশি বল ও আর্নাজ কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অনুষ্ঠানের ফিল্মের মূল নেগেটিভের পূর্ণ মালিকানা নিজেদের হাতে রেখেছিলেন। এর ফলে পুনঃপ্রচার থেকে আয় করার বড় সুযোগ তৈরি হয়। নতুন পর্ব নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেলেও একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান যে দীর্ঘদিন মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকতে পারে, ‘আই লাভ লুসি’ তা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সিরিজটির গল্পে তৎকালীন সমাজের সীমাবদ্ধতাও প্রতিফলিত হয়েছে। সংসারের বাইরে নিজের পরিচিতি তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে লুসি প্রায়ই ব্যর্থ হন এবং পরিচিত জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকে না। পরবর্তী পর্বে আবার নতুন সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার এই আকাঙ্ক্ষাই লুসিকে কেবল বিপত্তি ঘটানো এক গৃহিণীর পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেনি।

৭৫ বছর পরও সিরিজটির প্রভাবের স্বীকৃতি মিলছে। ২০২৬ সালে টেলিভিশন একাডেমির প্রথম ‘লিগ্যাসি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে ‘আই লাভ লুসি’। দর্শক, সংস্কৃতি ও টেলিভিশনশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছে এই সম্মান।

চকলেট কারখানার চলন্ত বেল্টের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাওয়া সেই লুসি আজও দর্শককে হাসাচ্ছেন। সময় বদলেছে, বদলেছে টেলিভিশনের প্রযুক্তি ও দর্শকের রুচি। কিন্তু লুসিল বলের অভিনয়, চরিত্রগুলোর আন্তরিকতা আর দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিপত্তি থেকে হাসি তৈরির কৌশল এখনো অমলিন। আর এভাবেই ‘আই লাভ লুসি’ শুধু একটি জনপ্রিয় সিটকম নয়, টেলিভিশন ইতিহাসের এক স্থায়ী অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

Advertisements