জন্মদিনে মায়ের দেওয়া বিলাসবহুল গাড়ি, সেই গাড়ির ধা’ক্কায় প্রাণ গেল তিন তরুণের

ভারতের কেরালায় দ্রুতগতির একটি মিনি কুপার গাড়ির ধাক্কায় তিন তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ১৯ বছর বয়সী চালক সুহাইল সাজিভের অতীতে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কয়েকটি ভিডিও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ছেলের জন্মদিনে তাকে বিলাসবহুল গাড়িটি উপহার দেওয়ার বিষয়ে তার মায়ের একটি ভিডিও।
রোববার (১১ অক্টোবর) ভোরে কেরালার এরনাকুলাম জেলার নেদুম্বাসেরি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সুহাইলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনার কারণ, চালকের ভূমিকা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেবিকা (২১), গোপিকা (২২) ও ইজাজ (২১) নামের তিন তরুণ একটি স্কুটারে করে বিমানবন্দর এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে পেছন থেকে দ্রুতগতিতে আসা মিনি কুপার গাড়িটি তাদের স্কুটারে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় তিনজনই সড়কে ছিটকে পড়েন। ধাক্কার পর গাড়িটি স্কুটারটিকে প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দেবিকা ও গোপিকার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ইজাজকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরে তার মৃত্যু হয়। তিন তরুণের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এ ঘটনায় সুহাইলের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনার সময় তিনি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
দুর্ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সুহাইলের আগের কিছু ভিডিও। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব ভিডিওতে তাকে ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালাতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে তার গাড়ির গতি ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব ভিডিওর সঙ্গে দুর্ঘটনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
অন্যদিকে, ছেলের জন্মদিনে মিনি কুপার উপহার দেওয়ার বিষয়ে সুহাইলের মায়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মালয়ালম ভাষায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, বিলাসবহুল গাড়িটি ছিল ছেলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে পরিবারের সদস্যরা আনন্দিত হয়েছিলেন।
সুহাইলের মা আরও জানান, ছেলের জন্মদিনে উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই গাড়িটি কেনা হয়েছিল। নিজের জন্মদিন ডিসেম্বরে হওয়ায় ওই সময়ের কাছাকাছি গাড়ি কেনার কথা ভাবলেও পরে ছেলের জন্য উপহার হিসেবে গাড়িটি কেনার ব্যবস্থা করেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর সুহাইলের কথিত কিছু মন্তব্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশকে তিনি বলেছিলেন, ‘রাস্তা কিসের জন্য? গাড়ি চালানোর জন্য, তাই না?’ এ ছাড়া তার বাবা বিষয়টি সামলে নেবেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, দুর্ঘটনার আগে সুহাইলকে মদ পরিবেশন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। কেরালার আবগারি ও করবিষয়ক মন্ত্রী এম লিজু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্ভাব্যভাবে জড়িত বারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের ধারণা, সংঘর্ষের আগে সুহাইল একাধিক পানশালায় মদ পান করে থাকতে পারেন।
কেরালায় আইন অনুযায়ী মদ্যপানের ন্যূনতম বয়স ২৩ বছর। সে হিসেবে ১৯ বছর বয়সী সুহাইলকে মদ পরিবেশন করা হয়ে থাকলে তা আইন লঙ্ঘনের শামিল হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পানশালাগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই দুর্ঘটনা আবারও সড়কে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, দায়িত্বহীন আচরণ এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর ঝুঁকি সামনে এনেছে। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতা বা বেপরোয়া সিদ্ধান্ত যে একাধিক পরিবারের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, কেরালার এই মর্মান্তিক ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।



