১২ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ শুধু ব্যয় নয়, জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি: ডা. জুবাইদা রহমান

jubaida-20260511123819

নারীর স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগকে কেবল চিকিৎসা খাতের ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; বরং এটি মানবসম্পদের বিকাশ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এমন মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।

রোববার (১১ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) আয়োজিত ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হল-২-এ অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে নারীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নতুন অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুফল শুধু ব্যক্তিগত সুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবারের জীবনমান, জাতীয় উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে। তাই কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবাকে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তরের কেন্দ্রে রাখার অঙ্গীকার করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।

নারীর উন্নয়নে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশে নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের অগ্রযাত্রার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জুবাইদা রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া নারীশিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তি কার্যক্রমের মতো উদ্যোগ বহু কিশোরীর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সহায়তা করে।

Advertisements

এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকার নারীর স্বাস্থ্য খাতে নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান তিনি।

কিশোরী থেকে প্রবীণ—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা

ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে, নারীর স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসাকে বোঝায় না। বরং কিশোরীবেলা থেকে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ লক্ষ্যে কিশোরীদের পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও নবজাতকের চিকিৎসা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

তাঁর মতে, নারীর বয়স, শারীরিক প্রয়োজন ও জীবনপরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়বে এবং নারীরা পরিবার ও সমাজে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এক লাখ কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং কর্মী এবং অতিরিক্ত ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর কথা তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা, মাতৃ ও নবজাতকের চিকিৎসার মান উন্নত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমিয়ে আনা।

তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি জরুরি প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবাও নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জুবাইদা রহমান বলেন, কোনো নারীকে যেন প্রয়োজনীয় ও মৌলিক মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের উপজেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে না হয়—এটাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। তবে জটিল রোগ বা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁর মতে, নারীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

২৫ কোটি ইউরোর অর্থায়নে নতুন উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন অর্থায়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) ও ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় বাংলাদেশের নারীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের নতুন উদ্যোগের উপস্থাপনা।

জুবাইদা রহমান জানান, বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে ২৫ কোটি ইউরোর রেয়াতি ঋণ অর্থায়নের চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি ইউএনএফপিএ অতিরিক্ত ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে। এই অর্থায়ন নারীর স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা উন্নয়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নারীর স্বাস্থ্য

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইউএনএফপিএর চিফ অব স্টাফ ড. নিগিনা মুনতিয়ান। মূল বক্তব্য দেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক ড. দিয়েন কেইতা।

উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার, জার্মানির ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি স্টেট সেক্রেটারি ড. বারবেল কফলার, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিন্টাহ আকানদোহ এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। বার্লিনের এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে নারীর স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম শর্ত। নারীর স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে তার সুফল পৌঁছাবে পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।

Advertisements