ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন রাখবেন কোথায়!বালিশের পাশে ফোন রেখে ঘুমানো কতটা নিরাপদ?

ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, মেসেজের উত্তর দেওয়া কিংবা অ্যালার্ম সেট করে বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন অনেকেই। কিন্তু রাতভর ফোন শরীরের কাছে রাখার অভ্যাস কতটা নিরাপদ? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, রেডিয়েশন নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ঘুমের মান ভালো রাখতে ফোনের ব্যবহার ও অবস্থানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
দিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় শুয়ে মোবাইল ফোনে একটু সময় কাটানো এখন অনেকের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। কখনো ভিডিও দেখা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট, আবার কখনো পরদিনের কাজের প্রস্তুতি—সবকিছুর সঙ্গী এই ছোট্ট যন্ত্রটি। কিন্তু ঘুমানোর সময়ও ফোনটি হাতের নাগালে রাখার অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, ঘুমের সময় ফোন কি বালিশের পাশে রাখা উচিত, নাকি কিছুটা দূরে? এ ক্ষেত্রে রেডিয়েশনের পাশাপাশি ফোন ব্যবহারের সময়, স্ক্রিনের আলো এবং নোটিফিকেশনের প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন কতটা ক্ষতিকর?

মোবাইল ফোন থেকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথের মতো প্রযুক্তি এসব তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করে। এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো এগুলো আয়নকারী বিকিরণ নয়; অর্থাৎ একইভাবে সরাসরি ডিএনএর রাসায়নিক বন্ধন ভাঙতে পারে না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রচলিত মাত্রায় মোবাইল ফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের সঙ্গে গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার নিশ্চিত কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এ বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
ফোন শরীরের যত কাছে থাকে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শরীরের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শক্তি শোষণের পরিমাণ তত বাড়তে পারে। এ বিষয়টি পরিমাপের একটি পদ্ধতি হলো স্পেসিফিক অ্যাবসর্পশন রেট (এসএআর)। ফোনের মডেলভেদে এ হার ভিন্ন হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে ফোন মাথার একেবারে পাশে রেখে ঘুমানোর পরিবর্তে কিছুটা দূরে রাখা একটি সহজ সতর্কতামূলক অভ্যাস।
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় স্ক্রিনের আলো
রাতে ফোন ব্যবহারের অন্যতম বাস্তব সমস্যা হলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব পড়া। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করার ফলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। এতে শরীর ও মনকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বেশি সময় লাগতে পারে।
ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত আলো, বিশেষ করে উজ্জ্বল ও নীল আলো, শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়িকে প্রভাবিত করতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে ঘুম আসতে দেরি হওয়া কিংবা ঘুমের মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু ফোনের অবস্থান নয়, ঘুমানোর আগে কতক্ষণ সেটি ব্যবহার করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নোটিফিকেশনের শব্দেও নষ্ট হতে পারে রাতের ঘুম
রাতে ফোনের রিংটোন, মেসেজের শব্দ, কম্পন কিংবা হঠাৎ জ্বলে ওঠা স্ক্রিন ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। কখনো এসব কারণে ঘুম ভেঙে যায়, আবার কখনো পুরোপুরি জেগে না উঠলেও ঘুমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে যাঁরা রাতের বেলায় বারবার ফোনের নোটিফিকেশন পরীক্ষা করেন, তাঁদের ঘুমের সময় কমে যেতে পারে। ফলে সকালে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা দিনের বেলায় ঝিমুনি অনুভূত হতে পারে।
ঘুমের সময় ফোন রাখবেন কোথায়?

ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোনটি বালিশের নিচে বা মাথার একেবারে পাশে না রেখে বিছানা থেকে কিছুটা দূরে টেবিল বা স্ট্যান্ডে রাখতে পারেন। সম্ভব হলে প্রায় এক মিটার দূরে রাখা একটি ব্যবহারিক অভ্যাস হতে পারে। তবে এই দূরত্বকে সবার জন্য নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাসীমা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।ফোন দূরে রাখলে ঘুমের মধ্যে বারবার সেটি হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। পাশাপাশি স্ক্রিনের আলো ও নোটিফিকেশনের কারণে ঘুমের ব্যাঘাতও এড়ানো সহজ হয়।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন- চার্জ দেওয়ার সময় ফোন বালিশের নিচে বা বিছানার চাদরের মধ্যে রাখবেন না। এতে তাপ জমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফোন চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং শক্ত, সমতল ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গা ব্যবহার করুন।
এয়ারপ্লেন ও ডু নট ডিস্টার্ব মোডের সুবিধা
রাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা অন্য বেতার সংযোগের প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখতে পারেন। এতে সাধারণত মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়; তবে ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ আলাদাভাবে চালু করা সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিংস পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
অন্যদিকে, ডু নট ডিস্টার্ব মোড চালু করলে অপ্রয়োজনীয় কল, বার্তা ও নোটিফিকেশনের শব্দ বা কম্পন বন্ধ রাখা যায়। জরুরি যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির কল চালু রাখার সুবিধাও অনেক ফোনে রয়েছে। ফোনের অ্যালার্ম ব্যবহার করলে এয়ারপ্লেন মোডে সেটি কাজ করছে কি না, আগে পরীক্ষা করে নিন। চাইলে ফোনের পরিবর্তে আলাদা অ্যালার্ম ঘড়িও ব্যবহার করতে পারেন।
ঘুমানোর আগে গড়ে তুলুন কয়েকটি ভালো অভ্যাস
ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিনের রুটিনে কিছু সহজ পরিবর্তন আনতে পারেন।
-ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন।
-প্রয়োজন হলে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে নাইট মোড ব্যবহার করুন, তবে মনে রাখবেন, এতে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের সব প্রভাব দূর হয় না।
-রাতে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
-প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন।
-ঘুমানোর আগে ফোন স্ক্রল করার পরিবর্তে বই পড়া, হালকা সংগীত শোনা বা কিছুক্ষণ নীরবে বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
-ফোন নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই জরুরি
ঘুমের সময় মোবাইল ফোন পাশে রাখলেই ক্যানসার বা অন্য কোনো গুরুতর রোগ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই রেডিয়েশন নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ফোনের ব্যবহার যেন ঘুমের সময়, মান ও স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট না করে, সেদিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু রাতের বিশ্রামের সময় এর ব্যবহার সীমিত রাখাও সমান জরুরি। তাই ঘুমানোর সময় ফোনটি বালিশের নিচে না রেখে কিছুটা দূরে রাখুন, নোটিফিকেশন বন্ধ করুন এবং স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন। ছোট এই অভ্যাসগুলোই আপনাকে আরও নিয়মিত ও স্বস্তিদায়ক ঘুমের পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।



