প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে? বদলে ফেলুন এই অভ্যাসগুলো

রাতের গভীর ঘুমে হঠাৎ ভয় পেয়ে জেগে ওঠা, অস্বস্তি নিয়ে বিছানায় বসে থাকা কিংবা স্বপ্নের আতঙ্ক কাটাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া—দুঃস্বপ্নের এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক হলেও নিয়মিত এমন হলে ব্যাহত হতে পারে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ। মানসিক চাপ কমানো থেকে শুরু করে ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন—কিছু সহজ পদক্ষেপে ভালো ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
ঘুম শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করার অন্যতম উপায়। কিন্তু ঘুমের মধ্যেই যদি ভয়, উদ্বেগ কিংবা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে পরদিনও তার প্রভাব থেকে যেতে পারে। সাধারণ খারাপ স্বপ্নের তুলনায় দুঃস্বপ্ন বেশি তীব্র হয় এবং অনেক সময় ঘুম ভেঙে যায়। নিয়মিত দুঃস্বপ্নের কারণে ঘুমের ঘাটতি, ক্লান্তি ও দিনের বেলায় মনোযোগের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তবে দুঃস্বপ্ন মানেই কোনো গুরুতর অসুস্থতা নয়। মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম কিংবা কিছু ওষুধের প্রভাবেও এমন হতে পারে। রাতে দুঃস্বপ্নের প্রবণতা কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি অভ্যাস পরিবর্তন করে দেখতে পারেন।
১. মানসিক চাপ কমিয়ে মন শান্ত রাখুন
মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে। দিনের বেলায় জমে থাকা দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ কিংবা কোনো মানসিক আঘাত ঘুমের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ঘুমানোর আগে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করুন।
এ জন্য হালকা যোগব্যায়াম, ধ্যান, ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন কিংবা ডায়েরিতে নিজের অনুভূতি লিখে রাখার অভ্যাস করতে পারেন। ঘুমানোর আগে কাজের চাপ বা উদ্বেগ বাড়ায় এমন বিষয় থেকে কিছুটা দূরে থাকাও উপকারী হতে পারে।
২. ঘুমের ঘর হোক আরামদায়ক
শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শোবার ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন, আলো কমিয়ে দিন এবং ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখার চেষ্টা করুন। বিছানা ও বালিশ যেন আপনার জন্য স্বস্তিদায়ক হয়, সেদিকেও নজর দিন।
বাইরের শব্দে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে প্রয়োজন অনুযায়ী কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করতে পারেন। কারও কারও ক্ষেত্রে কম শব্দের প্রকৃতির আওয়াজ বা হোয়াইট নয়েজ ঘুমের পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, আরামদায়ক ঘর দুঃস্বপ্ন পুরোপুরি বন্ধ করার নিশ্চয়তা দেয় না।
৩. ঘুমের ভঙ্গিতে আনুন পরিবর্তন
ঘুমানোর ভঙ্গির সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে চিত হয়ে ঘুমানোর সঙ্গে স্বপ্নের বিষয়বস্তু বা দুঃস্বপ্নের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে কিছু গবেষণায়। তবে এ বিষয়ে প্রমাণ সীমিত; সবার ক্ষেত্রে একই ফল হয় না।
চিত হয়ে ঘুমালে অস্বস্তি বোধ করলে কাত হয়ে শুয়ে দেখতে পারেন। পিঠের পাশে একটি বালিশ রাখলে একই ভঙ্গিতে থাকতে সুবিধা হতে পারে। তবে ঘুমের ভঙ্গি বদলালেই দুঃস্বপ্ন বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
৪. ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার নয়
রাতে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়লে বদহজম, বুকজ্বালা কিংবা অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। এসব অস্বস্তি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ঘুমানোর প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়া ভালো অভ্যাস।
মধ্যরাতে ক্ষুধা লাগলে অল্প পরিমাণে হালকা খাবার বেছে নিন। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। তবে নির্দিষ্ট কোনো খাবার খেলেই দুঃস্বপ্ন হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
৫. সুগন্ধি তেলে মিলতে পারে প্রশান্তি
ল্যাভেন্ডার বা ক্যামোমাইলের মতো কিছু সুগন্ধ অনেকের কাছে প্রশান্তিদায়ক মনে হতে পারে। ঘুমানোর আগে হালকা সুবাস ব্যবহার করলে কারও কারও আরাম অনুভূত হতে পারে। তবে এসেনশিয়াল অয়েল দুঃস্বপ্ন প্রতিরোধ করে—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
সুগন্ধি তেল ব্যবহার করতে চাইলে নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করুন। সরাসরি ত্বকে লাগানোর আগে উপযুক্তভাবে মিশিয়ে নেওয়া জরুরি। অ্যালার্জি, হাঁপানি বা সুগন্ধিতে সংবেদনশীলতা থাকলে সতর্ক থাকুন। বালিশে সরাসরি তেল ঢেলে না দিয়ে নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়াই ভালো।
৬. ঘুমের নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও সকালে ওঠার চেষ্টা করুন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। ঘুমানোর আগে ফোন বা টেলিভিশনের ব্যবহার কমিয়ে দিন এবং রাতে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
ঘুম থেকে উঠে দুঃস্বপ্নের কথা মনে থাকলে সেটি লিখে রাখতে পারেন। এতে কোনো নির্দিষ্ট উদ্বেগ বা পরিস্থিতির সঙ্গে স্বপ্নের সম্পর্ক আছে কি না, তা বুঝতে সুবিধা হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা সাধারণ বিষয়। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিয়মিত দুঃস্বপ্ন হলে, ঘুমাতে ভয় লাগলে, দিনের কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হলে কিংবা অতীতের কোনো মানসিক আঘাতের সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বারবার দুঃস্বপ্নের ক্ষেত্রে ইমেজারি রিহার্সাল থেরাপি (আইআরটি) নামে একটি চিকিৎসাপদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। এতে দুঃস্বপ্নের কাহিনি জেগে থাকা অবস্থায় নতুন, কম ভীতিকর পরিণতি দিয়ে কল্পনা করার অনুশীলন করা হয়। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তায় এ পদ্ধতি শেখা যায়।
মনে রাখবেন: দুঃস্বপ্ন এড়ানোর কোনো একক বা নিশ্চিত উপায় নেই। তবে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ঘুম, আরামদায়ক পরিবেশ এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা—এই পদক্ষেপগুলো রাতের ঘুমকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে।



