৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

ভালোবাসা থাকলেও কেন টেকে না সংসার?

63cd6828f13c286accf184fcd0845ddf-674ed9c266ab0

বিয়ের পর দুজন মানুষের জীবন একসঙ্গে চলতে শুরু করলেই যে সম্পর্ক সহজ হয়ে যায়, এমন নয়। বরং তখনই শুরু হয় একে অপরকে নতুনভাবে বোঝার পর্ব। ভালোবাসার পাশাপাশি সংসারে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক চাপ, কাজের ব্যস্ততা, পরিবার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্যক্তিগত প্রত্যাশা। এসব জায়গায় বোঝাপড়ার ঘাটতি তৈরি হলে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে তারকা দম্পতিদের বিচ্ছেদের খবর সামনে এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা যায়। কেউ দায় দেন আধুনিক জীবনযাপনকে, কেউ বলেন নতুন প্রজন্মের ধৈর্য কম। কিন্তু একটি সম্পর্ক কেন ভাঙছে, তার প্রকৃত কারণ বাইরে থেকে অনুমান করা সহজ নয়। বরং এসব ঘটনা আমাদের নিজেদের সম্পর্কের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে।

বিয়ের পর বদলে যায় সম্পর্কের বাস্তবতা

প্রেমের সময় একজন মানুষকে যে পরিস্থিতিতে দেখা যায়, সংসারজীবনে তাকে পাওয়া যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। তখন দেখা যায় ক্লান্তি, আর্থিক টানাপোড়েন, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা পরিবারের দায়িত্বের সঙ্গে একজন মানুষ কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন।

তাই বিয়ের আগে দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকলেও দাম্পত্য জীবনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে প্রস্তুত থাকা জরুরি। শুধু ভালো লাগা বা আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও দুজনের মধ্যে স্পষ্ট আলোচনা থাকা প্রয়োজন।

কেন বাড়ছে বিচ্ছেদের প্রবণতা?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে প্রতি হাজারে বিবাহবিচ্ছেদের হার ০.৭ থেকে বেড়ে ১.৪ হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ১.১-এ নামে।

ঢাকায় বিচ্ছেদের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩ হাজার ২৮৮টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছিল। তবে এই পরিসংখ্যান থেকে শুধু তরুণ প্রজন্মের বিচ্ছেদের হার নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

Advertisements

বর্তমান সময়ে নারীদের আর্থিক ও সামাজিক সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অসুখী বা ক্ষতিকর সম্পর্কে থাকার পরিবর্তে অনেকেই আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। তাই বিচ্ছেদকে সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিছু সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা একজন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়ও হতে পারে।

বড় ঝগড়ার চেয়ে ছোট অবহেলা বেশি ক্ষতিকর

দাম্পত্য জীবনের সংকট সব সময় বড় কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় দিনের পর দিন জমতে থাকা ছোট ছোট অভিমানই একসময় বড় দেয়াল তৈরি করে।

সঙ্গী কথা বলার সময় ফোনে ব্যস্ত থাকা, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা এড়িয়ে যাওয়া, ঘরের কাজের দায়িত্ব একপাক্ষিক হয়ে যাওয়া কিংবা ঝগড়ার পর দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বন্ধ রাখা—এসব বিষয়কে শুরুতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত ঘটতে থাকলে এগুলো সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যানের গবেষণাতেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন ছোট ছোট পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব উঠে এসেছে। অর্থাৎ সঙ্গী যখন কথা বলতে চান বা নিজের কোনো অনুভূতি ভাগ করে নিতে চান, তখন তাকে গুরুত্ব দিয়ে সাড়া দেওয়া সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো সম্পর্ক শুধু বড় আয়োজন বা বিশেষ দিনে প্রকাশ পায় না। প্রতিদিনের ছোট আচরণেই তার ভিত্তি তৈরি হয়।

তরুণ দম্পতিদের ওপর নতুন ধরনের চাপ

বর্তমান প্রজন্মের দাম্পত্য জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নতুন এক চাপ তৈরি করেছে। অন্য দম্পতিদের সাজানো, আনন্দময় মুহূর্ত দেখে নিজের সম্পর্ককে তার সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে একজন জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে একই সঙ্গে বন্ধু, প্রেমিক বা প্রেমিকা, মানসিক সমর্থনদাতা এবং ক্যারিয়ার সহযোগীর ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। প্রত্যাশা যত বাড়ে, হতাশার সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।

এ ছাড়া বিয়ের আগে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত, চাকরি ও ক্যারিয়ার, শ্বশুরবাড়ি বা বাবার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিষয় নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা না থাকলেও পরে তা দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কী করা যায়?

সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত কিছু অভ্যাসও দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রথমত, প্রতিদিন কিছু সময় শুধু দুজনের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়ে ফোন বা অন্য ব্যস্ততা দূরে রেখে মনোযোগ দিয়ে কথা বলা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, মতবিরোধ হলে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা উচিত। ‘তুমি কখনোই আমাকে বোঝো না’ বলার পরিবর্তে ‘এই ঘটনায় আমি কষ্ট পেয়েছি’—এভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা তুলনামূলক কার্যকর।

তৃতীয়ত, বিয়ের আগেই অর্থ, সন্তান, ক্যারিয়ার ও দুই পরিবারের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা দরকার।

চতুর্থত, সমস্যা দীর্ঘদিন জমিয়ে না রেখে প্রয়োজন হলে দম্পতি কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। সম্পর্কের সমস্যাকে সাহায্য নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখাও সুস্থ সম্পর্কের অংশ।

বিচ্ছেদ নয়, সম্পর্কের স্বাস্থ্য নিয়েই ভাবা জরুরি

প্রতিটি বিচ্ছেদকে ব্যর্থতা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি সম্পর্ককে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও সঠিক নয়। যেখানে সম্মান, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা নেই, সেখানে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় হতে পারে।

তবে যে সম্পর্কগুলোতে এখনও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে, সেগুলো ভাঙনের দিকে যাওয়ার আগেই সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি। কারণ সংসার সাধারণত একদিনে ভেঙে যায় না। অনেক সময় সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট নীরবতা, অবহেলা আর না বলা কথার মধ্য দিয়ে।

সম্পর্ককে তাই শুধু ‘টিকে আছে’ কি না, তা দিয়ে বিচার না করে দুজন মানুষ সেখানে কতটা শোনা, বোঝা ও সম্মানিত বোধ করছেন—সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

Advertisements