২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

আজ বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস

jolatongko_20260422_122834556

কুকুর-বিড়ালের কামড়ে বাড়ছে আতঙ্ক , দুই বছরে আক্রান্ত বেড়েছে ৫৫ শতাংশ

একদিকে বাড়ছে পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়াল পালনের প্রবণতা, অন্যদিকে কমেছে কুকুরের টিকাদান ও সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম। এরই মধ্যে কুকুর ও বিড়ালের কামড়-আঁচড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রাজধানীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে বিভিন্ন প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

সারাদেশে কুকুর-বিড়ালের আক্রমণের শিকার মানুষের সঠিক সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। তবে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির একটি ধারণা দিচ্ছে। ২০২৪ সালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন। পরের বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩। আর চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রমের ঘাটতি এবং পোষা বিড়াল পালনের প্রবণতা বৃদ্ধি। ফলে প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘একসঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী’। জলাতঙ্ক প্রতিরোধ, আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা এবং রোগটি নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিনের অন্যতম লক্ষ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর জলাতঙ্কে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুকুরের মাধ্যমে ঘটে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণের চক্র ভাঙা সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি।

উপসর্গ দেখা দিলে সময় থাকে না

Advertisements

জলাতঙ্কের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—রোগের উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাই কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্য কোনো সন্দেহজনক প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফএ আসমা খান বলেন, কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নিতে হবে। অনেকেই প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে পরে হাসপাতালে আসেন। এতে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র দেখা যায় হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রেও। গতকাল রোববার রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর থেকে দেড় বছরের সন্তান রাইয়ানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন মা রেহেনা আক্তার। কয়েক দিন আগে বাড়ির পোষা বিড়াল শিশুটির ডান হাতে কামড় দেয়। চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু হয়েছে জলাতঙ্কের টিকা। ইনজেকশনের যন্ত্রণায় হাসপাতালের বারান্দায় বসেই কাঁদছিল শিশুটি।

একই হাসপাতালে টিকা নিতে এসেছিলেন মোহাম্মাদপুরের চাঁদ উদ্যানের শারমিনা আক্তার খাদিজা। তাঁর ভাষ্য, বাসার পাশে একটি বিড়াল বাচ্চা প্রসব করার পর সেগুলোকে খাওয়ানোর সময় হঠাৎ বিড়ালটি তাঁর হাতে কামড় দেয়। হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা এক নার্স জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পোষা বিড়ালের কামড়ের শিকার হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেকেই পোষা বিড়ালকে নিয়মিত টিকা দেন না। গত তিন-চার বছরে বিড়ালের আক্রমণের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে জানান তিনি।

থেমে গেছে কুকুর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

জলাতঙ্ক নির্মূলে বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এর আওতায় কুকুরকে টিকা দেওয়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। ৬৪ জেলার সবগুলোতে প্রথম দফার টিকাদান শেষ হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় ৪৬টি এবং তৃতীয় দফায় আটটি জেলায় টিকা দেওয়া হয়।

তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কর্মসূচিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে নতুন করে কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

টিকার সংকটেও প্রশ্ন

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যবহৃত টিকার সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অপারেশন প্ল্যান ২০২৪ সালে বন্ধ হওয়ার পর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় টিকার সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত এপ্রিল জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র ছাড়াই ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কাছ থেকে ৯ লাখ জোড়া টিকা কেনা হয়। বর্তমানে সরকারের হাতে প্রায় ৫৯ হাজার ডোজ টিকা মজুত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দ্রুত সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনেই দরপত্র ছাড়া টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানান সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। তবে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, নিয়মিত প্রক্রিয়ায় টিকা কেনা হলে তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ থাকত।

সিডিসির সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ডোজ র‍্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ৩ লাখ ডোজ র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন সরবরাহের কার্যক্রম রয়েছে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে সেই পরিকল্পনায় মানুষের টিকাদানের বিষয়টিই গুরুত্ব পাচ্ছে; কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।

মৃত্যুও কমেনি

শুধু কামড়-আঁচড়ের ঘটনা নয়, দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগ তৈরি করছে। ২০২৪ সালে এ রোগে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে মৃত্যু হয় ৫৯ জনের। চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসেই মারা গেছেন ৩৫ জন। দেশে জলাতঙ্কের চিকিৎসা দেওয়া হয় দুটি হাসপাতালে। তবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে রোগ প্রতিরোধে টিকা সরবরাহ ও টিকাদান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান দ্রুত পরিষ্কার করা, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

কারণ জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় বিষয়। উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্রাণঘাতী এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর সেই প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে মানুষের পাশাপাশি কুকুর-বিড়ালের টিকাদান ও প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো সমন্বিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisements