Skip to content

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ডাকবক্সের সোনালি অতীত

যদি বলা হয় আপনার সবচেয়ে জরুরি জিনিস কী? অনেকেই না ভেবেই বল দেবেন মোবাইলফোন। কারণ মোবাইলফোন ছাড়া মানুষ এখন এক মিনিটও কল্পনা করতে পারে না। দৈনন্দিন ও অফিসসহ অন্যান্য জরুরি কাজ এখন মোবাইলফোনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে এখন আর বই বা জ্ঞানীগুণীদের পরামর্শ নিতে যায় না, এখন গুগলে এক ক্লিকে নিমিষেই সব তথ্য পাওয়া যায়।

তবে একটু ভাবুন তো, বর্তমানে মোবাইল, ইন্টারনেট, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি না থাকতো তাহলে কেমন হতো। কীভাবে যোগাযোগ করতেন একে অপরের সঙ্গে। গত দুই দশকে যাদের জন্ম তারা এগুলো কল্পনা করতে পারেন না। চলুন দেখে আসি ইন্টারনেট, ফেসবুক, ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া সত্তর কি আশির দশকের মানুষেরা কিভাবে তাদের যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতো।

নব্বই দশক পর্যন্ত যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল চিঠি এবং জরুরি বার্তার আদান প্রদানের জন্য টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন ব্যবহৃত হতো। একমাত্র জেলা শহর ব্যতিত গ্রামীণ জনপদে টেলিফোনের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত। পরিবার কিংবা প্রিয়জনের চিঠির জন্য অপেক্ষায় থাকতেন এলাকার প্রবাসীরা।

এখন আর সেই দিন নেই। নানা তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে দিন বদলের মতো পাল্টে গেছে সবকিছু। এখন এক নিমিষে খবরা খবর পৌঁছে যাচ্ছে ঘর থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে। প্রতি সেকেন্ডে আলাপ চলছে অত্যাধুনিক মোবাইলফোনে। শুধু মোবাইলফোনে কথা বলছে না, সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় ব্যক্তির ছবিও দেখছে। চোখের পলকে খবর পৌঁছে যাচ্ছে কম্পিউটারাইজম সিস্টেম তথ্য প্রযুক্তির আরেক মাত্রা ই-মেইলে। ডিজিটাল যুগের একধাপ পরিবর্তনের ফলে অচল হয়ে গেছে ডাকে চিঠি প্রেরণ ও টেলিগ্রাফের যুগ।

১৮৬৩ সালে আমেরিকায় ডাক বিভাগের প্রবর্তন ঘটলেও ১৮৭৪ সাল থেকে এসে গঠিত
হয় জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন। উপমহাদেশে প্রথম ডাক সার্ভিস চালু হয় ১৭৭৪ সালে। বাংলাদেশের ডাক বিভাগের ইতিহাসও অনেক পুরনো, ১৫০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এগিয়ে চলা ডাক বিভাগ আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। দেশে প্রায় ১০ হাজারের মতো পোস্ট অফিস রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ডাকসেবা হিসেবে ডাকঘর চিঠিপত্র, পোস্ট কার্ড, পার্সেল ইত্যাদির সেবা প্রদান করে থাকে।

এক জরিপে দেখা যায়, ২০০৪ সালেও দেশে ২৩ কোটি চিঠি লেনদেন হয়েছে। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সাধারণ চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে ৫ কোটি আর ২০১৪-১৫ সালে হয়েছে ৪ কোটি। এভাবেই প্রতিবছর ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার দিন দিন কমছে। পুরনো দিনের চিঠি আজও প্রবীণ ও
মধ্য বয়সীদের জীবন অধ্যায়ের পাতা। একটা সময় ডাকপিয়নেরও কদর ছিল যথেষ্ট। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি বিলি করার নানা মজার ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। অনেক ডাকপিয়ন প্রণয়-ঘটিত অনেক বিয়ের নীরব সাক্ষী। পিঠে চিঠির বস্তা নিয়ে ঝুনঝুন ঘণ্টা বাজিয়ে রাতের আঁধারে রানার ছুটতো দূরের পথে।

তথ্য প্রযুক্তির যুগে ডাক বিভাগের ধরণ আর কাজের পরিধির মধ্যে এসেছে নানা পরিবর্তন। কালের বিবর্তনে হয়তো পরিবর্তন এসে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির আদল ধারণ করবে। তখন হয়তো ডাকঘরের আভিধানিক অর্থ এবং কাজের ধরনও পাল্টে যাবে।

রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা তাবাসসুম রেহমান বলেন, বাড়ির লেটারবক্সগুলো এখন বেশিরভাগ সময় খালিই পড়ে থাকে। এখন সেগুলোয় মাঝে মধ্যে জমা হয় ইলেকট্রিক বিল, ফোনের বিল বা ক্রেডিট কার্ডের বিল। কিন্তু চিঠিপত্র আজকাল আর আসে না। আসবে কী করে? আজকাল ইমেইল, মেসেজ, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ক’জন আর চিঠি লেখে বলুন! চিঠি লেখার অভ্যাসটাই তো হারিয়ে গেছে।সেই জন্যই তো ২০১৩ সালে বন্ধই করে দিতে হল ১৬৩ বছরের প্রাচীন টেলিগ্রাম পরিষেবাকে। লাল রঙের, গোল মাথাওয়ালা ছোট থামের মতো দেখতে সেই ডাক বাক্স যা একটা সময় শহরের অলিতে গলিতে দেখা যেত, তা এখন ‘ভ্যানিস’ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, দিন গড়াচ্ছে, যুগ যাচ্ছে বদলে। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে অনেক পুরনো রীতিও। এমন একটি পুরনো রীতি ছিল চিঠি লেখা। এমন এক সময় ছিল যখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। চিঠি চালাচালির মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এমন সময়ও ছিল যখন পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে দিয়ে খবর পাঠানো হতো। মনের মাধুরী মিশিয়ে চিঠি লেখার মজাই ছিল আলাদা। কাগজে লিখে খামে পুরে চিঠি পাঠানো হতো। চিঠি লেখার জন্য ছিল পোস্টকার্ড ও বিভিন্ন রঙ-বেরঙের প্যাড।

রাজধানীর পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বাসিন্দা রঙ্গলাল বাবু বলেন, এক সময় ডাকপিয়নের কদর ছিল ঘরে ঘরে। দুপুর বেলা পিওনের ‘চিঠি আছে গো’ ডাক শুনে দ্রুত সদর দরজায় ছুটে আসত বাড়ির কচিকাঁচারা। যার চিঠি এল না, সেও অপেক্ষা করে থাকত পরদিন দুপুরের জন্য। শুধু দৈনন্দিন জীবনে নয়, উৎসবের মৌসুমে আপনজনকে শুভেচ্ছা জানাতেও চিঠি ছিল প্রধান মাধ্যম। স্মার্টফোনের যুগে চিঠি এখন ‘বিলুপ্তপ্রায়’।

বরিশালের কলেজ এভিনিউনর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক রেজাউল চৌধুরী বলেন, আমি প্রথম চিঠি লেখা শিখছি বাবার কাছ থাকে। আমার বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় যোগাযোগ চিঠির মাধ্যমে সাড়তাম। আমার যে সহধর্মিণী তার সাথে ও আমার প্রথম কথা হয়েছিল চিঠির মাধ্যমে। আমার প্রথম চিঠিটি ওর মায়ের হাতে গায়ে পড়ছিল। তখনকার সময়ে চিঠিই ছিল ভালোবাসার মাধ্যম। ওকে লেখা প্রথম চিঠিতে আমার কত আবেগ, কত রোমাঞ্চ আর ভালোবাসা ছিল এখনো সেই দিনগুলো মনে পড়ে। তা হয়তো এই সময়ের প্রেমিক–প্রেমিকারা বুঝবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘চিঠি লেখাও একটা শিল্প। এক সময়ে ঢাকা থেকে আমার আত্মীয়রা চিঠি পাঠাতো।
এখনও আমার সংগ্রহে সেই চিঠি রয়েছে। সমাজ তো আধুনিক হবেই। তবে আমি চাই না ঐতিহ্য হারিয়ে যাক। ডাক বাক্স এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকলে নবীনরা চিঠির গুরুত্ব বুঝবে কিভাবে? এ বিষয়ে ডাক বিভাগের ভাবার সময় এসেছে।

লেখক: রায়হান হোসেন
শিক্ষার্থী
ঢাকা কলেজ