গরমে মেজাজ খিটখিটে, বৃষ্টিতে বিষণ্ণতা—এর পেছনে কী কারণ?

একদিনের আবহাওয়া কখনো কখনো পুরো দিনের মুড বদলে দিতে পারে। সকালের উজ্জ্বল রোদে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, আবার টানা বৃষ্টি অনেককে ঘরে থাকতে ও নিরিবিলি সময় কাটাতে আগ্রহী করে তোলে। শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, আলো, তাপমাত্রা ও ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের ঘুম, আচরণ এবং মানসিক অবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ট্রেভর হার্লি তাঁর ‘হেড ইন দ্য ক্লাউডস: হাউ দ্য ওয়েদার অ্যাফেক্টস আওয়ার মাইন্ডস অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ’ বইয়ে আবহাওয়া ও মানুষের মনস্তত্ত্বের এই সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সূর্যের আলো কমলে মনেও পড়তে পারে প্রভাব
শীত বা দীর্ঘ সময় কম আলোযুক্ত পরিবেশে থাকার কারণে কিছু মানুষের মেজাজ ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুম, ক্লান্তি, মন খারাপ বা আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। এ ধরনের মৌসুমি বিষণ্ণতাকে ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ বা এসএডি বলা হয়।
এর পেছনে দিনের আলোর ঘাটতি একটি ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যাপ্ত আলো না পাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বা বডি ক্লকের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

অতিরিক্ত গরমে বাড়তে পারে অস্বস্তি
শুধু ঠান্ডা বা কম আলো নয়, অতিরিক্ত তাপমাত্রাও মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচণ্ড গরমে শরীরে অস্বস্তি তৈরি হয়, ঘুম ব্যাহত হতে পারে এবং অনেকের ক্ষেত্রে বিরক্তি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে গরমের সঙ্গে যখন বাতাসে আর্দ্রতাও বেশি থাকে, তখন স্বাভাবিক কাজ করাও অনেকের কাছে বেশি কষ্টকর মনে হতে পারে। ফলে মেজাজ খারাপ বা ধৈর্য কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
একই আবহাওয়া, ভিন্ন মানুষের ভিন্ন অনুভূতি
আবহাওয়ার প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। কেউ বৃষ্টির শব্দে স্বস্তি পান, আবার কারও কাছে বৃষ্টির দিন একঘেয়ে মনে হতে পারে। একইভাবে, কেউ শীত উপভোগ করেন, আবার কেউ সূর্যের উষ্ণতা ও গরম আবহাওয়া বেশি পছন্দ করেন।
তবে আবহাওয়া মানুষের সামাজিক আচরণেও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। উজ্জ্বল ও মনোরম দিনে বাইরে বের হওয়া, মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে অনেকেই তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে থাকতে এবং নিজের চিন্তাভাবনায় সময় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বৃষ্টির শব্দ বা প্রকৃতির দৃশ্য কেন ভালো লাগে?
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, মাটির গন্ধ কিংবা ঝড়ের আগে আকাশের পরিবর্তন অনেকের মধ্যে একধরনের প্রশান্তি তৈরি করে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য মানুষের মনোযোগকে দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে আনতে পারে।
হঠাৎ বৃষ্টি থেমে সূর্যের আলো ফুটে ওঠা কিংবা আকাশের রং বদলে যাওয়ার মতো দৃশ্যও মানুষের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করে। প্রকৃতির প্রতি এই বিস্ময় বা মুগ্ধতার অনুভূতি মানসিকভাবে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

আবহাওয়ার প্রভাব সামলাবেন যেভাবে
আবহাওয়া নিজের ইচ্ছামতো বদলানো সম্ভব নয়। তবে এর কারণে দৈনন্দিন জীবনে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গরমের দিনে পর্যাপ্ত পানি পান ও আরামদায়ক পরিবেশে থাকা, শীত বা কম আলোযুক্ত সময়ে ঘরে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং বৃষ্টির দিনে ঘরেই পছন্দের কোনো কাজে সময় দেওয়া—এসব ছোট অভ্যাস দৈনন্দিন মেজাজ ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
জন্মের ঋতুর সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে?
কোন ঋতুতে একজন মানুষের জন্ম হয়েছে, তার সঙ্গে পরবর্তী জীবনের কিছু ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য বা মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকির সামান্য সম্পর্ক থাকতে পারে—এমন কিছু গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গর্ভকালীন ও শৈশবের শুরুতে আলো, তাপমাত্রা এবং পরিবেশগত বিভিন্ন পার্থক্যের কথা বিবেচনা করা হয়।
তবে এসব সম্পর্ককে ব্যক্তিত্ব নির্ধারণের নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখা যায় না। মানুষের আচরণ ও মানসিক গঠনে পারিবারিক পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, জেনেটিক বৈশিষ্ট্যসহ আরও অনেক বিষয় ভূমিকা রাখে।
মন ভালো রাখতে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকুন
ব্যস্ততার মধ্যে আমরা অনেক সময় চারপাশের প্রকৃতির দিকে তাকানোর সুযোগই পাই না। অথচ কয়েক মিনিট আকাশ দেখা, বৃষ্টির শব্দ শোনা কিংবা সকালের রোদে কিছুটা সময় কাটানোও মনকে বিরতি দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
আবহাওয়া আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু প্রতিদিনের মেজাজ পুরোপুরি তার ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজের অভ্যাস ও পরিবেশকে সামান্য পরিবর্তন করে আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সামলে নেওয়া সম্ভব।



