১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শিক্ষা

এসএসসি পেরিয়েই ঝরে পড়ার শঙ্কা, একাদশে আবেদন করেনি দেড় লাখ শিক্ষার্থী

ssc-2026

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চলতি বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর একাদশে ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে তাদের সবাই যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, এমনটা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য এখনো শিক্ষা প্রশাসনের হাতে নেই। এদের কতজন অন্য কোনো ধারার শিক্ষায় যুক্ত হয়েছে আর কতজন সত্যিই ঝরে পড়েছে, সে হিসাবও পাওয়া যায়নি।

আগের বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যান অবশ্য শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা তুলে ধরেছে। এসব তথ্য অনুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে বিয়ের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ৭ শতাংশের বেশি পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। বাকিদের কেউ অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়েছে। প্রায় ৫১ শতাংশ আর পড়াশোনায় ফেরেনি।

চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। প্রথম ধাপের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, আবেদনকারী ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। তবে আবেদন করেও ১৪ হাজার ৪১৫ জন কোনো আসন পায়নি। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী রয়েছেন ২ হাজার ২০৫ জন।

একাদশে ভর্তির এই চিত্রে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে—কোথাও শিক্ষার্থীর জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, আবার কোথাও শিক্ষার্থীর অভাবে কলেজে তৈরি হয়েছে শূন্যতা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ১১টি কলেজে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীও আবেদন করেনি। আরও ৪১৬টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন জমা পড়লেও কোনো শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়নি। প্রায় ৮০০ কলেজ ও মাদ্রাসা পেয়েছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী।

চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির জন্য অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ হাজার ১৮০টি। অথচ সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন রয়েছে ২৫ লাখেরও বেশি। ফলে এবারে প্রায় ১৫ লাখ আসন খালি পড়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকার অনেক কলেজে শিক্ষার্থী সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই সময়ে দেশের পরিচিত ও নামিদামি কলেজগুলোতে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সেখানে আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। আবেদনের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ। ৯৮১টি আসনের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিতে আবেদন করেছে ৩২ হাজার ৬৭৮ জন। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ২ হাজার ৩৭৯টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩২ হাজার ৬৪০টি। আর ঢাকা সিটি কলেজে ৪ হাজার ২৮০টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৩১ হাজার ৯৫১ জন।

Advertisements

আবেদনের দিক থেকে এগিয়ে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ-ঢাকা, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ এবং সরকারি তোলারাম কলেজ।

জিপিএ-৫ পাওয়া ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেও কোনো কলেজে নির্বাচিত না হওয়ার ঘটনাটিও আলোচনায় এসেছে। একাদশে ভর্তির নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দক্রমে রাখতে পারে। এরপর এসএসসির ফলাফল, প্রাপ্ত নম্বর এবং পছন্দক্রমের ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ফলে শুধু জিপিএ-৫ পেলেই পছন্দের কলেজ নিশ্চিত হয় না। কোনো কলেজে আসনের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হয়। একজন শিক্ষার্থী তার পছন্দের কয়েকটি কলেজে আসন না পেলে পরবর্তী পছন্দের কলেজও বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু কেউ যদি খুব সীমিত সংখ্যক কলেজ পছন্দ হিসেবে দেয় এবং সেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা বেশি থাকে, তাহলে জিপিএ-৫ পেয়েও প্রথম ধাপে কোনো কলেজ না পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ভর্তি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব শিক্ষার্থী পুরোপুরি ভর্তি-সুযোগের বাইরে চলে যায়নি। পরবর্তী ধাপে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে তাদের নতুন করে কলেজ বরাদ্দ দেওয়া হবে। মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশের পর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে গ্রাম ও মফস্সলের কলেজগুলোর চিত্র নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষদের ভাষ্য, আশপাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ও পাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে একাদশে ভর্তির সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে। যারা এসএসসি পাস করছে, তাদের অনেকেই আবার জেলা শহর কিংবা বড় শহরের তুলনামূলক পরিচিত কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে স্থানীয় কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা গ্রামীণ কলেজগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে না পড়ে অনেক শিক্ষার্থী জেলা বা বিভাগীয় শহরের কলেজকে ভবিষ্যতের জন্য বেশি সুবিধাজনক মনে করছে। এর ফলে একদিকে নামি কলেজগুলোতে ভর্তি নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বহু গ্রামীণ কলেজে শ্রেণিকক্ষ পূরণ করাই কঠিন হয়ে উঠছে।

এসএসসি পাস করার পর প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থীর একাদশে ভর্তির আবেদন না করা তাই শুধু ভর্তি-পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা, পারিবারিক ও আর্থিক বাস্তবতা এবং দেশের শহর-গ্রামভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্যের মতো বড় প্রশ্ন। তাদের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে মাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বাস্তব চিত্রটিও আরও পরিষ্কার হবে।

Advertisements