টাকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি, উইপোকার হাত থেকে বাঁচাবেন যেভাবে

ঘরের আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখা টাকা। পাশে গুরুত্বপূর্ণ দলিল, পুরোনো ছবি, চিঠি কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। বছরের পর বছর এসব জিনিস নিরাপদেই আছে—এমনটাই ধরে নেন বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু কাঠের আলমারি কিংবা ড্রয়ারের ভেতরেই যদি নীরবে বাসা বাঁধে উইপোকা, তাহলে মুহূর্তে বদলে যেতে পারে পুরো চিত্র।
উইপোকা আসলে টাকা খাওয়ার জন্য কাগজের নোটে হামলে পড়ে না। তাদের মূল খাবার সেলুলোজ—উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরের প্রধান উপাদান। কাঠে প্রচুর সেলুলোজ থাকে। আর কাগজ ও কাগজজাত অনেক উপকরণও উদ্ভিজ্জ তন্তু থেকে তৈরি হওয়ায় উইপোকার খাবারে পরিণত হতে পারে। তাই টাকা, বই, কার্ডবোর্ড, পুরোনো চিঠি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নথিও রেহাই পায় না।
টাকা নষ্টের ঘটনাও কম নয়
উইপোকার কারণে সঞ্চয়ের টাকা নষ্ট হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি গাইবান্ধায় এক কৃষকের জমানো প্রায় দুই লাখ টাকা উইপোকা ও ইঁদুরের কারণে নষ্ট হওয়ার খবর আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেই কৃষকের অসহায়ত্বও দেখা যায়।
দেশের বাইরেও এমন ঘটনার নজির রয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌর কাছাকাছি স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার একটি শাখায় প্রায় এক কোটি রুপি উইপোকায় নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। ব্যাংকের নিরাপদ কক্ষে স্টিলের বাক্সে রাখা থাকলেও টাকাগুলো শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। এর কয়েক বছর আগে, ২০১৩ সালে চীনের গুয়াংডং প্রদেশে এক নারীর প্রায় চার লাখ ইউয়ানও উইপোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায়। সন্তানদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া অর্থ তিনি কাঠের ড্রয়ারে রেখেছিলেন। ছয় মাস পর ড্রয়ার খুলে দেখেন, সঞ্চয়ের বড় অংশই উইপোকার খাবারে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রকৃতির জন্য উইপোকা একেবারে অপ্রয়োজনীয় প্রাণী নয়। বনভূমিতে মৃত ও পচনশীল কাঠ ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিতে তাদের ভূমিকা রয়েছে। এতে পুষ্টি পুনঃচক্রায়নে সহায়তা করে এবং মাটির গুণমান বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। সমস্যা তৈরি হয় যখন তারা ঘরের কাঠের আসবাব, বই কিংবা মূল্যবান কাগজপত্রে বাসা বাঁধে।
গুরুত্বপূর্ণ নথি কোথায় রাখবেন?
বাড়িতে থাকা দলিল, পাসপোর্ট, উইল, করসংক্রান্ত কাগজ, শিক্ষাগত সনদ, পুরোনো ছবি কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি সাধারণত দীর্ঘদিন একই জায়গায় পড়ে থাকে। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে বিপদ। বিশেষ করে কাঠের আলমারি বা ড্রয়ারে এসব কাগজ সরাসরি রাখা নিরাপদ নয়। কারণ উইপোকা কাঠের ভেতর থেকে ক্ষতি করতে পারে এবং অনেক সময় বাইরে থেকে তার কোনো লক্ষণও দেখা যায় না। কাঠের ওপরের পাতলা স্তর অক্ষত রেখেই ভেতরে ভেতরে পুরো কাঠামো ফাঁপা করে দিতে পারে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সিল করা ধাতব বা ভালো মানের প্লাস্টিকের বাক্সে রাখা ভালো। এতে কাগজ সরাসরি কাঠের সংস্পর্শে থাকবে না এবং আর্দ্রতা ও পোকামাকড়ের ঝুঁকিও কমবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর ডিজিটাল কপিও আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখা যেতে পারে।
ঘরে উইপোকার উপদ্রব কমাবেন কীভাবে?
উইপোকার সবচেয়ে পছন্দের পরিবেশ হলো স্যাঁতসেঁতে ও আর্দ্র জায়গা। তাই বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। নর্দমা ও ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে এবং আসবাবের আশপাশে দীর্ঘদিন আর্দ্রতা জমতে দেওয়া ঠিক নয়।
বই ও কাগজপত্রও দীর্ঘদিন একই জায়গায় ফেলে না রেখে মাঝেমধ্যে বের করে দেখা ভালো। আলমারি, ড্রয়ার ও কাঠের আসবাব নিয়মিত পরিষ্কার করলে উইপোকার উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
নিমপাতা বা নিমভিত্তিক উপাদান নিয়ে অনেকেই ঘরোয়া প্রতিরোধের কথা বলেন। তবে এগুলোকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে না দেখে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করাই ভালো। একইভাবে লবণ, কর্পূর বা ন্যাপথলিনের মতো ঘরোয়া উপায়ও উইপোকা নির্মূলের নির্ভরযোগ্য বিকল্প নয়। কেরোসিন বা অন্য দাহ্য পদার্থ কাঠের আসবাব কিংবা ঘরের ভেতরে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, পোষা প্রাণী বা আগুনের উৎসের কাছে এসব ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
উইপোকার আক্রমণ যদি ব্যাপক হয়, তাহলে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে পেশাদার কীটনাশক নিয়ন্ত্রণসেবা নেওয়াই ভালো। কারণ শুধু চোখে দেখা উইপোকা সরালেই সমস্যার সমাধান হয় না; অনেক সময় কাঠের গভীরে বা মাটির নিচে তাদের কলোনি থেকে যায়।
সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো—টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি কাঠের আলমারি বা ড্রয়ারে সরাসরি না রাখা, ঘর শুকনো ও পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত আসবাবপত্র পরীক্ষা করা। কারণ উইপোকা যখন চোখে পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।



