১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বিনোদন

বিশ্বজুড়ে যে কণ্ঠ ছড়িয়ে দিয়েছে লালনগীতি

বিশ্বজুড়ে যে কণ্ঠ ছড়িয়ে দিয়েছে লালনগীতি

লালনের গানকে সাধনা ও জীবনদর্শনের অংশ করে যিনি কয়েক দশক ধরে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন, সেই কিংবদন্তি লালনসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলাদেশের অসংখ্য দর্শকশ্রোতার কাছে লালনগীতি মানেই যেন ফরিদা পারভীন। অথচ ফরিদা পারভীনের সংগীতজীবনের সূচনা হয়েছিল নজরুলসংগীত দিয়ে। একসময় নজরুলের গানই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। লালনের গানের সঙ্গে তার পরিচিত হওয়ার গল্প অনেকটা হঠাৎ করেই।

যুদ্ধের সময়ও সঙ্গে ছিল হারমোনিয়াম
ফরিদা পারভীনের ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। সেই সময়ের একটা বড় অংশ কেটেছে মাগুরায়। আর মাগুরাতেই গানের প্রতি তাঁর টানটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। গান শেখার আগেই গান শুনতে ভালোবাসতেন তিনি। আশপাশে কোথাও গান বাজলে মন চলে যেত সেদিকে। দেখলেন নিজের বাড়িতে হারমোনিয়াম নেই, পাশের ভাড়াটের বাড়িতে আছে। ছোট ফরিদার কাছে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠল।

পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম বাজছে শুনে রাতে ছুটে যেতেন। উঠানের ভেতর দিয়ে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতেন। কারও কাছে কিছু বলতেন না, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারমোনিয়াম বাজানো দেখতেন। ভেতরে তখন রাগও হতো এই ভেবে যে, অন্যের বাড়িতে হারমোনিয়াম আছে, তাঁর নেই।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘বাবার সঙ্গে জেদ করছি আমার হারমোনিয়াম বানিয়ে দাও, আমি হাতেখড়ি দেব, আমি গান শিখব। মাগুরায় আমরা তখন ভাড়া বাসায় থাকি, পাশেই আরও দু-একজন ভাড়াটে আছে। তাদের একজনের বাসায় হারমোনিয়াম আছে, অথচ আমার হারমোনিয়াম নেই, বোঝেন অবস্থা!’

বাবাও শেষ পর্যন্ত মেয়ের জেদের কাছে হার মানলেন। কলকাতা থেকে হারমোনিয়াম তৈরির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা হলো, তৈরি হলো হারমোনিয়াম।

ফরিদা পারভীনের স্মৃতিকথায় এসেছে সেই হারমোনিয়ামের কথা। জীবনের নানা সময়েও তাঁর সঙ্গে থেকেছে হারমোনিয়ামটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন অনেক কিছু ফেলে নিরাপদ জায়গায় যেতে হয়েছিল, তখনও হারমোনিয়ামটি সঙ্গে নিয়েছিলেন। এমনকি পাকিস্তানি সেনারা দেখে ফেললে তাঁকে রেডিওতে গান গাওয়ার জন্য নিয়ে যেতে পারে—এই ভয় থেকে একটা সময় হারমোনিয়াম মাটির নিচে পুঁতে রাখার কথাও তিনি বলেছেন।

Advertisements

ফরিদা পারভীন তখন কুষ্টিয়ায়
১৯৬৮ সাল থেকেই ফরিদা পারভীন রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতের শিল্পী। অর্থাৎ তাঁর সংগীতজীবনের প্রথম পরিচিতি তৈরি হয়েছিল নজরুলের গান দিয়েই। এই সময়টায় নজরুলসংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। ফলে লালনের গান সামনে এলেও প্রথমে সেদিকে খুব একটা আগ্রহ ছিল না।

১৯৭৩ সাল। ফরিদা পারভীন তখন কুষ্টিয়ায়। দোল পূর্ণিমায় ছেঁউড়িয়ার লালনের আখড়ায় বড় আয়োজন হবে। আখড়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এমন একজন চিকিৎসক ফরিদার বাবার কাছে এসে বললেন, ‘মেয়েটি যদি দু-একটা গান গায়, ভালো হয়।’

বাবা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন। ফরিদা পারভীনের উত্তর ছিল, ‘দূর, লালন ফকিরির গান করব! এই একটা কথা হলো! আমি তো নজরুলের গান করি। সেই আমি ফকিরির গান করব!’

কিন্তু অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাঁকে লালন ফকিরের ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি একটু শেখানো হলো। প্রথম দিকে এই গান নিয়ে ফরিদার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। বাবা অবশ্য বোঝালেন, নজরুলের পাশাপাশি দু-একটা লালনের গান শিখলে ক্ষতি কী।

তারপর সেই গান নিয়ে উঠলেন ছেঁউড়িয়ার মঞ্চে। এই গান শুনে শ্রোতারা এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, গান শেষ হওয়ার পর বারবার আরেকটি গান শোনানোর অনুরোধ করতে থাকলেন তাঁরা। কিন্তু নজরুলের গানের গুণমুগ্ধ ফরিদা পারভীনের আর কোনো লালনগীতি জানা নেই। বাধ্য হয়ে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই, আবার শিখে আসি, তারপর আরও গান গাইব।’

কথাটা হয়তো তখন শ্রোতাদের সামলানোর জন্যই বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে অন্য পৃথিবীর হাতছানি। একদিন যে গান নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না, সেই গানই ধীরে ধীরে তাঁর নিজের গান হয়ে উঠতে শুরু করল।

‘লালন সম্রাজ্ঞী’,লালন কন্যা এসব উপাধি আমি একদমই পছন্দ করি না’
লালনের গানের রয়েছে নিজস্ব ঢঙ। এই সুর আয়ত্ত করতে কম কষ্ট করেননি ফরিদা পারভীন। হেলাফেলা থেকে শুরু হলেও লালনকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে সবসময় সাধনা করেছেন। বিভিন্ন সাধক ও ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছেন। মোকছেদ আলী সাঁইয়ের পর খোদা বক্স সাঁই, করিম সাঁই, ব্রজেন দাসসহ আরও অনেকের কাছে গান শিখেছেন।

এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কুষ্টিয়ায় বড় হওয়ার ফলে লালনের গানের প্রকৃত ঢঙটা আপনাতেই এসেছে। আর ভাষা নিয়ে আমি চর্চা করেছি। পরে বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার শিক্ষক বলতেন, তুমি যেহেতু গান করো, ফলে তোমার উচ্চারণ হতে হবে শতভাগ শুদ্ধ। এর বাইরে আমি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান খুব শুনতাম।’

ধীরে ধীরে কুষ্টিয়ার শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা দেশে। ১৯৮৭ সালে লালনগীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক পান। ১৯৯৩ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ ছবির ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি পান। ২০০৮ সালে পান জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান কালচার পুরস্কার।

দেশের বাইরে গিয়েও লালনের গান নিয়ে কাজ করেছেন। ২০০১ সালে জাপানের বিভিন্ন শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লালনের গান পরিবেশন করেন। পরে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও তাঁর কণ্ঠে লালনের গান পৌঁছেছে।

লালনের গানকে পরের প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন ফরিদা পারভীন। শিশুদের জন্য ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

সেখানেও লালনের গান সংরক্ষণ, স্বরলিপি তৈরি এবং বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহশালা তৈরির পরিকল্পনাও ছিল তাঁর কাজের অংশ। লালন চর্চার এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও নিজের পরিচয় নিয়ে ফরিদা পারভীনের ভাবনাটা ছিল বেশ আলাদা। তাঁকে অনেকে নানা নামে ডাকতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি সেইসব উপাধি পছন্দ করেননি।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘লালনের গানের সম্রাজ্ঞী হওয়া যায় না, অবগাহন করা যায়, আত্মস্থ করা যায়। এসব সম্রাজ্ঞী, রাণী, লালন কন্যা এসব উপাধি অযথা। এসব আমি একদমই পছন্দ করি না। কেউ যদি লালনের বাণীগুলো অন্তর থেকে আত্মস্থ করতে পারে সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। এসব নাম দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।’

ফরিদা পারভীনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—তিনি লালনের গানকে ঘর থেকে ঘরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়েছেন। একসময় লালনের গান ছিল সীমিত শ্রোতাদের কাছে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে তা পৌঁছে গেছে প্রতিটি মানুষের অন্তরে।

আজ যখন তরুণ প্রজন্ম লালনের গান শুনে, তারা যেন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে শুনেই শেখে। এটাই তাঁর শিল্পীসত্তার সর্বোচ্চ সাফল্য।

ফরিদা পারভীন চলে গেছেন, কিন্তু তিনি চিরঞ্জীব হয়ে আছেন তাঁর গানের সুরে। লালন যেমন তাঁর দর্শনের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন, তেমনি ফরিদা পারভীন বেঁচে থাকবেন তাঁর গাওয়া গানগুলোর মধ্য দিয়ে।

আমরা তাঁকে হারিয়েছি, কিন্তু তাঁর গান আমাদের হারাবে না কখনো। তাঁর সুর, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর আবেগ বেঁচে থাকবে—যতদিন বাংলা গান বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি টিকে থাকবে।

Advertisements