৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

ইশারায় শুরু প্রেম, বিয়ের ৭ মাস পরও শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি হাওয়ার

c5163f4c-49be-455b-b176-c4752e85b24c

সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে ভালোবাসার এক ব্যতিক্রমী গল্প এখন আলোচনায়। সুস্থ, কর্মক্ষম যুবক টিটু মিয়া ভালোবেসে বিয়ে করেছেন জন্মগতভাবে কথা বলা ও শোনার সক্ষমতাহীন হাওয়া আক্তারকে। কোনো যৌতুক বা দাবি-দাওয়া ছাড়াই তাদের বিয়ে হলেও সাত মাস পেরিয়ে গেছে, এখনো স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে তুলতে পারেননি টিটু।

টিটু মিয়া মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের টেপিরকোনা গ্রামের আব্দুল গণির ছেলে। ৩০ বছর বয়সী টিটু দিনমজুরের কাজ করেন। তার স্ত্রী হাওয়া আক্তার (২৭) দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের মীর্জাপুর গ্রামের মৃত মৌলা মিয়া ও রাশিদা আক্তারের বড় মেয়ে। জন্ম থেকেই হাওয়া কথা বলতে ও শুনতে পারেন না।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হাওয়ার সঙ্গে টিটুর পরিচয় হয়। খালার বাড়ির পাশেই হাওয়াদের বাড়ি। মাত্র তিন দিনের পরিচয়েই দুজনের মধ্যে ভালো লাগা তৈরি হয়। একপর্যায়ে টিটু হাওয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মুখে কথা বলতে না পারলেও চোখ ও হাতের ইশারায় সম্মতি জানান হাওয়া। পরে কাজী সিরাজুল হকের মাধ্যমে কোনো যৌতুক ছাড়াই তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তবে বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় নতুন সংকট। টিটুর বাবা এই বিয়ে মেনে নিলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা তা মেনে নেননি। ফলে বিয়ের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও হাওয়াকে শ্বশুরবাড়িতে নিতে পারেননি টিটু। বর্তমানে হাওয়ার বাবার জরাজীর্ণ বাড়িতেই স্ত্রীকে নিয়ে থাকছেন তিনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টিটুর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাওয়া সন্তানসম্ভবা হলে তাকে বাড়িতে নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যেও তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের বারান্দায় মুখোমুখি বসে আছেন টিটু ও হাওয়া। টিটু মুখে প্রশ্ন করছেন, আর হাওয়া চোখ ও হাতের ইশারায় উত্তর দিচ্ছেন। কথা বলতে বা শুনতে না পারলেও দুজনের মধ্যে যোগাযোগে কোনো বড় সমস্যা দেখা যায়নি।

Advertisements

হাওয়া ঘরের কাজও করেন নিয়মিত। ভোরে ঘর-আঙিনা পরিষ্কার করা, হাওরের পানিতে হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া, গরুকে খড় খাওয়ানো, পাশের বাড়ি থেকে পানি আনা এবং গোবর ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জ্বালানি তৈরি—সংসারের নানা কাজই করেন তিনি।

টিটুর মা কাছনা আক্তার বলেন, হাওয়া কথা বলতে পারেন না এবং কানে শুনতেও পারেন না। এ কারণে টিটুর ভাই-বোন ও বন্ধুরা এ বিয়ে মেনে নেয়নি। তবে তিনি হাওয়াকে ঘরে তোলার চেষ্টা করবেন বলে জানান।

টিটুর বাবা কাছা মিয়া বলেন, বিয়ে আল্লাহর দান। মেয়েটিকে টিটুর ভালো লেগেছে, তাই সে বিয়ে করেছে। দুই পরিবারই দরিদ্র উল্লেখ করে তিনি তাদের থাকার জন্য একটি ভালো ঘর করে দিতে সরকার বা কোনো সংস্থার সহযোগিতা কামনা করেন।

হাওয়ার মা রাশিদা আক্তার বলেন, ছয় সদস্যের সংসারে তার দুই সন্তান প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন। মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। কোনো যৌতুক ছাড়াই টিটু তাঁর মেয়েকে বিয়ে করবেন, তা তিনি কখনো ভাবেননি।

স্থানীয় গৃহিণী ফুলবানু বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থ ও যৌতুকের কারণে অনেক মেয়ের বিয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে টিটু কোনো দাবি ছাড়াই হাওয়াকে বিয়ে করেছেন। তাঁদের এলাকায় এমন ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানান তিনি।

ভালোবাসার টানে বিয়ে হলেও সাত মাস ধরে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই না পাওয়া হাওয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন দুই পরিবার ও স্থানীয়রা। ভালোবাসার এই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও পারিবারিক স্বীকৃতি পায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Advertisements