ছয় বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ, মেয়াদ পেরিয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামের

একদিকে গুরুতর রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন, অন্যদিকে হাসপাতালের মজুত কক্ষে পড়ে আছে আইসিইউর জন্য আনা ভেন্টিলেটর, হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, পেশেন্ট মনিটরসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। ছয় বছর আগে জরুরি ভিত্তিতে এসব যন্ত্রপাতি আনা হলেও বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে এখনো চালু হয়নি আইসিইউ সেবা। এরই মধ্যে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা বেশ কিছু সরঞ্জামের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।
২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সময় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে তিন শয্যার আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয় হাসপাতালে। কিন্তু আইসিইউ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল না থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। করোনাকালে অবশ্য কিছু সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল। করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় কয়েকটি ভেন্টিলেটর ও হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা কাজে লাগানো হয়। কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বাকি সরঞ্জামগুলো চলে যায় মজুত কক্ষে। ২০২১ ও ২০২২ সালে দুই দফায় যেসব যন্ত্রপাতি হাসপাতালে পৌঁছেছিল, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখনো বাক্সবন্দী বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতালের তৃতীয় তলার মজুত কক্ষে গেলে চোখে পড়ে তিন শয্যার আইসিইউর জন্য আনা বিপুলসংখ্যক সরঞ্জাম। সেখানে ছয়টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, তিনটি ভেন্টিলেটর, এবিজি মেশিন, পেশেন্ট মনিটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সারি করে রাখা রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব সরঞ্জামের বর্তমান কার্যক্ষমতা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সরবরাহের সময় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু সরঞ্জামের ব্যবহারের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে আসা যন্ত্রপাতির সেই মেয়াদ ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আসা সরঞ্জামগুলোর মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। অর্থাৎ রোগীর জীবন বাঁচাতে যে যন্ত্রপাতিগুলো জরুরি সময়ে কাজে লাগার কথা ছিল, সেগুলোর একটি অংশ এখন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর পড়ে আছে।
এদিকে বান্দরবানে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি আইসিইউর প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। মে মাস থেকে জেলায় হামের সংক্রমণ শুরু হয়। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন হামের উপসর্গযুক্ত রোগী আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত ৩৭ জন রোগীকে, বিশেষ করে শিশুদের, চট্টগ্রামে পাঠাতে হয়েছে।
আইসোলেশন ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (শিশু) রাশেদুল আলম বলেন, মজুত থাকা আইসিইউ সরঞ্জামগুলো সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। আগে পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেগুলো সচল ও নিরাপদ আছে কি না। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার কারণে অনেক সরঞ্জাম ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। শুধু আইসিইউ সরঞ্জামই নয়, করোনার সময় বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল কোটি টাকা মূল্যের একটি আরটি-পিসিআর ল্যাবও। করোনাভাইরাস শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ এই ল্যাবটি ছয় বছর ধরে ব্যবহার না হওয়ায় এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
ল্যাবটির আকারও কম নয়—দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে ৭ ফুট, প্রস্থে ৩ ফুট এবং উচ্চতায় ৭ দশমিক ২৫ ফুট। হাসপাতালের একটি কক্ষে এটি স্থাপনের জন্য দরজা কেটে প্রশস্ত করার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ল্যাবটি স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নির্মাণাধীন নতুন হাসপাতাল ভবনের কাজ শেষ হলে সেখানে ল্যাবটি স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে ল্যাব চালু করা যাবে না। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১৩ জন জনবল প্রয়োজন হবে এটি পরিচালনার জন্য। বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ারের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই বাস্তবতা। তাঁর মতে, ছয় বছর আগে যে সীমাবদ্ধতার কারণে আইসিইউ চালু করা যায়নি, এখনো তার বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। আইসিইউ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা, ২৪ ঘণ্টার প্রয়োজনীয় জনবল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ—সবই দরকার। কিন্তু এসবের ঘাটতি এখনো রয়েছে।
তবে কিছুটা আশার কথাও রয়েছে। নির্মাণাধীন নতুন হাসপাতাল ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আরএমও জানিয়েছেন, ভবনটির প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ভবনটি হস্তান্তরের পর প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে আইসিইউ চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ছয় বছর আগে জরুরি প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। কিন্তু অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে সেগুলোর বড় অংশই মানুষের সেবায় আসতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে কিছু সরঞ্জামের মেয়াদও শেষ হয়েছে। এখন প্রশ্ন—নতুন ভবন ও প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়ার পরও কি এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারযোগ্য থাকবে, নাকি নতুন করে সবকিছু সংগ্রহ করতে হবে? উত্তরটি নির্ভর করছে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের ওপর।



