‘ফান’ করতে গিয়ে কাউকে কষ্ট দিচ্ছেন না তো?

‘আরে, মজা করছিলাম!’—কথাটা আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি। কোনো বন্ধুকে নিয়ে ঠাট্টা করার পর, কারও চেহারা বা পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার পর কিংবা কারও ব্যক্তিগত কোনো বিষয় সবার সামনে তুলে ধরার পর পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে এই একটি বাক্য দিয়েই যেন সবকিছুর দায় শেষ করে দিতে চাই। কিন্তু যে কথাটি আমাদের কাছে নিছক মজা, সেটিই হয়তো অন্য কারও মনে গভীর আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মজার নামে কাউকে বিব্রত করা, ছোট করা কিংবা তার দুর্বল জায়গা নিয়ে হাসাহাসি করা আসলে মজা নয়। কারণ সুস্থ রসিকতায় আনন্দ থাকে, কিন্তু কাউকে অপমান করে পাওয়া হাসিতে অন্যের কষ্টও জড়িয়ে থাকতে পারে।
হাসির বিষয় আর হাসির পাত্র—দুটো এক নয়
বন্ধুদের আড্ডায় একে অপরকে নিয়ে মজা করা স্বাভাবিক। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে হালকা রসিকতা সম্পর্ককে আরও প্রাণবন্তও করতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন একজনের আনন্দ অন্যজনের অস্বস্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়।
কারও ওজন বেশি—তাই তাকে বারবার ‘মোটা’ বলে ডাকা, কারও গায়ের রং নিয়ে মন্তব্য করা, উচ্চতা, চেহারা, পোশাক কিংবা আর্থিক অবস্থা নিয়ে ঠাট্টা করা—এসবকে অনেক সময় ‘ফান’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এসব মন্তব্য একজন মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে। বিশেষ করে যে বিষয়গুলো নিয়ে একজন মানুষ নিজেই অনিরাপদ বোধ করেন, সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে রসিকতা করা আরও বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে।
‘সে তো কিছু বলেনি’—তাহলে কি সে কষ্ট পায়নি?
সবাই কষ্ট পেলে প্রতিবাদ করেন না। কেউ হাসি দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান, কেউ চুপ হয়ে যান, আবার কেউ পরিস্থিতি খারাপ না করার জন্য ভেতরের কষ্টটুকু লুকিয়ে রাখেন। তাই কেউ প্রতিবাদ করেনি মানেই সে বিষয়টি উপভোগ করেছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কারও মুখের হাসির আড়ালেও অস্বস্তি থাকতে পারে। আবার কেউ হয়তো আপনার কথায় আহত হয়েছেন, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে কিছু বলেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মজা’ আরও বিপজ্জনক
অনলাইনে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারও ছবি নিয়ে মিম বানানো, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা, বন্ধুর কোনো দুর্বল মুহূর্তকে নিয়ে পোস্ট দেওয়া কিংবা কমেন্টে অপমানজনক রসিকতা করা মুহূর্তের বিনোদন দিতে পারে। কিন্তু সেই পোস্ট বা মন্তব্য একবার ছড়িয়ে গেলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। যিনি বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দু, তার জন্য সেটি হয়তো নিছক কয়েক সেকেন্ডের হাসির ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের লজ্জা, অপমান কিংবা মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
মজা করার আগে কয়েকটি প্রশ্ন
কিছু বলার আগে নিজেকে একটু থামিয়ে প্রশ্ন করা যায়—এই কথাটি যদি আমাকে বলা হতো, আমার কেমন লাগত? বিষয়টি কি ব্যক্তিগত? এটি কি এমন কোনো জায়গা, যা নিয়ে মানুষটি আগে থেকেই অস্বস্তিতে আছেন? সবার সামনে বললে তিনি কি বিব্রত হতে পারেন?আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমি কি তার সঙ্গে হাসছি, নাকি তাকে নিয়ে হাসছি? এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
ভালো রসিকতায় কাউকে ছোট হতে হয় না
রসিকতা মানেই যে কাউকে আঘাত করতে হবে, এমন নয়। বরং সবচেয়ে সুন্দর মজা সেটিই, যেখানে সবাই হাসতে পারে এবং কাউকে নিজের সম্মান বিসর্জন দিতে হয় না। কাউকে নিয়ে মজা করার আগে তার সীমারেখাকে সম্মান করা তাই জরুরি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও প্রত্যেক মানুষের কিছু ব্যক্তিগত জায়গা থাকে। সম্পর্ক যত কাছেরই হোক, সেই সীমারেখা অতিক্রম করার অধিকার কেউ পায় না।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখা দরকার, আমাদের একটি কথাই হয়তো কয়েক সেকেন্ডের হাসি তৈরি করতে পারে, আবার সেই কথাই কারও মনে দীর্ঘদিনের ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই পরেরবার ‘মজা করছিলাম’ বলার আগে একটু ভাবুন—আপনার মজায় সবাই হাসছে তো? নাকি একজন নীরবে কষ্ট পাচ্ছেন?



