৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

জবির মেস থেকে ছাত্রীকে র‍্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা

11c63f56d0224dc9762514ba9d6c0172-6a9d12faf0b13

সকালের স্বাভাবিক ব্যস্ততা। রাজধানীর কলতাবাজারের একটি ছাত্রী মেসে তখনও দিনের শুরুটা ঠিকঠাকই চলছিল। হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে হাজির হয়ে নিজেদের র‍্যাবের সদস্য বলে পরিচয় দেন। জানান, একটি মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করতেই তাদের সেখানে আসা। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে জনসন রোডের ৫৩/৪ বি এলাকার ওই মেসে ঘটে এ ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বর্ষা খাতুনকে একটি র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে সঙ্গে না নিয়েই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চলে যান।

কী ঘটেছিল মেসে?

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সকালে কয়েকজন ব্যক্তি মেসে প্রবেশ করে নিজেদের র‍্যাব সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তারা একটি মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের কথা জানান। তবে বিষয়টি নিয়ে মেসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে গেলে দেখা যায়, বর্ষা খাতুনকে ইতোমধ্যে র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে।জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত মেসে যান। পরে বিষয়টি সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানান। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে উপস্থিত হন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে র‍্যাব পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলেও পরে র‍্যাবের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের হস্তক্ষেপের পর শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তি

ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা। সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, খবর পাওয়ার পর তারা দ্রুত সেখানে যান এবং একজন শিক্ষার্থীকে র‍্যাবের গাড়িতে দেখতে পান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে তা যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তারা সংশ্লিষ্টদের বলেন। সহকারী প্রক্টরের ভাষ্য, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি পুরো ঘটনার পেছনে কোনো অনিয়ম বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

Advertisements

‘চুরির মামলার আসামিকে ধরতে এসেছি’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. তারেক বিন আতিকও ঘটনাস্থলে যান। তার দাবি, প্রথমে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা ভুল করে ওই মেসে এসেছেন বলে জানান। পরে তারা বলেন, চুরির মামলার আসামিকে ধরতেই এসেছেন। এর মধ্যেই একজন শিক্ষার্থীকে গাড়িতে তোলা হয়। অধ্যাপক তারেক বলেন, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীকে গাড়িতে ওঠানো অবস্থায় দেখতে পান। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, শিক্ষার্থীকে এভাবে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রক্টর অফিস ও উপাচার্যকে অবহিত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

তবে ঘটনাস্থলে চুরির মামলার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি সেখানে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর জানতে চাওয়া হলেও তারা তা দিতে রাজি হননি বলেও জানান অধ্যাপক তারেক। তার ধারণা, শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেও মামলাটি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

পুলিশের বক্তব্য কী?

সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তার দাবি, সেখানে আসা ব্যক্তিরা র‍্যাবের সদস্য ছিলেন এবং একটি মামলার অভিযোগের ভিত্তিতেই ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিলেন। ওসি জানান, পরে তারা জানতে পারেন, মামলাটি পারিবারিক বিরোধের কারণে করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে সঙ্গে না নিয়েই সংশ্লিষ্টরা চলে যান। মামলাটির বিস্তারিত জানতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন ওসি।

ঘটনার নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধ?

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা খাতুনের বোনের সাবেক স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর বর্ষা খাতুনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে মেসে থাকা অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি ছাত্রী মেসে র‍্যাব পরিচয়ে প্রবেশ, একজন শিক্ষার্থীকে গাড়িতে তোলা এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাকে না নিয়ে চলে যাওয়া—পুরো ঘটনাই এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, মামলাটি কী, কার অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীকে নিতে যাওয়া হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সত্যিই কোনো আইনগত অভিযোগ থাকলে সেটির নিষ্পত্তিও আইন অনুযায়ীই করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়ম বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

Advertisements