৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

পরচুলা তৈরিতে স্বাবলম্বী গ্রামের নারীরা, বদলে যাচ্ছে পোড়াবাড়িয়ার চিত্র

WhatsApp-Image-2026-09-04-at-11.34.36-PM

একসময় সংসারের অভাব আর ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পোড়াবাড়িয়া গ্রামের শিরিন আক্তার। স্বামী অসুস্থ, মাথার ওপর ঋণের বোঝা, আর তিন সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানোর চিন্তায় দিন কাটছিল তার। ঘরে বসে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছিলেন না। ঠিক সেই সময় গ্রামের একটি কারখানায় নারীদের কাজের সুযোগের খবর পান তিনি। কৌতূহল থেকে সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, ফেলে দেওয়া চুল প্রক্রিয়াজাত করে সেখানে তৈরি করা হয় পরচুলা বা উইগ। কারখানায় কাজ করা প্রায় ২০০ নারীকে দেখে তিনিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরপর ২০২২ সালের নভেম্বরে সেখানে কাজে যোগ দেন। সেই সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে বদলে দেয় তার সংসারের চিত্র।

শিরিন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তার নাম ‘হেয়ার কোট’। এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা মানুষের ফেলে দেওয়া চুল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পরচুলা। কাজ শুরুর প্রথম মাসে শিরিনের আয় ছিল ৬ হাজার টাকা। বর্তমানে মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। এই আয় তার পরিবারের জন্য বাড়তি স্বস্তি এনে দিয়েছে।

শিরিনের জীবনে এই কাজের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল বেশ কঠিন এক পরিস্থিতিতে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গাছ থেকে পড়ে তার স্বামী তাইজুল শেখের ডান হাত ও পা ভেঙে যায়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ধারদেনা করতে হয় তাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও থেকেও ঋণ নেন। একপর্যায়ে তার ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। সংসারের খরচ চালানোর জন্য হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের চেষ্টা করলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছিল না। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও বাড়তে থাকে। এমন অবস্থায় পোড়াবাড়িয়ার পরচুলা তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করেন তিনি। নিজের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আয় দিয়ে ধীরে ধীরে সংসারের আর্থিক চাপ সামলানোর পথ তৈরি হয়।

পোড়াবাড়িয়াকে এখন শুধু একটি সাধারণ গ্রাম হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্পটি অনেকটাই অজানা থেকে যাবে। কারণ এই এলাকায় পরচুলা তৈরির কাজকে কেন্দ্র করে বহু নারী নিজেদের জন্য আয়ের পথ তৈরি করেছেন। হেয়ার কোট কারখানায় শুধু পোড়াবাড়িয়ার নারীরাই কাজ করেন না; গফরগাঁও উপজেলার ঘাগড়া, উথুরী, বাসুতিয়া, মহিরখারুয়া, মশাখালী, বাঘবাড়ি, মাইজবাড়ি, লংগাইর, কান্দিপাড়া, বাঘেরগাঁও, দিয়ারগাঁও, উস্থি, লামকাইন ও পাঁচবাগসহ মোট ১৫টি গ্রামের নারীরা এখানে কাজ করেন। শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ তিনটি পিকআপের ব্যবস্থা করেছে। এসব গাড়িতে করে কর্মীদের বিনা খরচে কারখানায় আনা-নেওয়া করা হয়।

গফরগাঁওয়ের এই কারখানাটি পরিচালনা করছে পিবাড়িয়া গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে পোড়াবাড়িয়ায় একটি ছোট কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগ বড় হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রুপটির অধীনে ১৮টি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ছয়টি, ময়মনসিংহে সাতটি, শেরপুরে একটি, জামালপুরে একটি, কিশোরগঞ্জে দুটি এবং নীলফামারীতে একটি কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ১ হাজার ৮৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার কারখানাগুলোতে ৪১০ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২৩০ জন, শেরপুরে ৪০ জন, জামালপুরে ২০ জন, কিশোরগঞ্জে ৬০ জন এবং নীলফামারীতে ৭০ জন কাজ করছেন। মোট শ্রমিকের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী।

এই শিল্পের মূল কাঁচামাল মানুষের ফেলে দেওয়া চুল। দেশের বিভিন্ন এলাকার সেলুন, বিউটি পারলার এবং গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো হকারদের কাছ থেকে এসব চুল সংগ্রহ করা হয়। চুলের আকার ও মান অনুযায়ী হকারদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ১৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে চুল কেনা হয়। পরে প্রক্রিয়াজাত করা চুলের দাম মান ও ধরন অনুযায়ী আরও বেড়ে যায়। এক কেজি প্রক্রিয়াজাত চুলের দাম প্রায় ৮ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

Advertisements

কারখানাগুলোতে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার কেজি চুল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পরচুলা তৈরি করা হয়। একটি উইগ তৈরিতে কাজের ধরন ও নকশা অনুযায়ী একজন শ্রমিকের এক দিন থেকে সর্বোচ্চ চার দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মান, আকার ও নকশার ওপর নির্ভর করে একটি পরচুলা তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পরচুলার দামও বেশ বৈচিত্র্যময়। সেখানে একটি উইগ ২২ মার্কিন ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হতে পারে।

পরচুলা তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ শ্রমনির্ভর। চুল সংগ্রহের পর প্রথমে এর দৈর্ঘ্য, মান ও ধরন অনুযায়ী বাছাই করা হয়। এরপর চুল পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো কোনো চুলে রংও করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ধাপগুলোর একটি হলো ‘নটিং’। এই পর্যায়ে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রস্তুত করা চুলের ছোট ছোট গুচ্ছ হাতে গিঁট দিয়ে একটি বিশেষ ক্যাপের সঙ্গে বসানো হয়। দক্ষতা ও ধৈর্য প্রয়োজন হওয়ায় কাজটি আয়ত্ত করতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

পোড়াবাড়িয়ার এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই তৈরি করেনি, অনেকের জীবনযাপনেও পরিবর্তন এনেছে। একই কারখানে কাজ করা সাথী আক্তার জানান, বর্তমানে তার মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে তিনি বাড়িতে টিউবওয়েলের মোটর লাগিয়েছেন, ফ্রিজ কিনেছেন এবং পরিবারের আরও বেশ কিছু প্রয়োজন মিটিয়েছেন। তার মতো অনেক নারী নিজেদের আয় দিয়ে সংসারে অবদান রাখার পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।

মাফিয়া আক্তারের গল্পটিও আলাদা করে বলার মতো। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি পরচুলা তৈরির কাজে যুক্ত হন। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে তার মাসিক আয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের জন্য আয়ের পথও তৈরি করেছে।

নারীদের কাজের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে কারখানাটির আরেকটি দিক হলো প্রশিক্ষণ। পোড়াবাড়িয়ার কারখানায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে নারীদের পরচুলা তৈরির বিভিন্ন ধাপ শেখাচ্ছেন প্রশিক্ষক হোসনা আক্তার। তার মতে, নারী ও পুরুষ—দুই ধরনের মানুষের জন্যই পরচুলা তৈরি করা হয়। তবে পুরুষদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ও আকারের উইগের চাহিদা বেশি। প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শিখে অনেক নারী এখন নিজেরাই নিয়মিত আয় করছেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থায় ভূমিকা রাখছেন।

এখানে শ্রমিকদের মজুরি নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। কে কতগুলো এবং কী ধরনের পরচুলা তৈরি করেছেন, তার ওপর নির্ভর করে আয় নির্ধারিত হয়। কাজের ধরন ও পরচুলার আকার অনুযায়ী একটি উইগ তৈরির জন্য শ্রমিকরা প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পেতে পারেন। সব মিলিয়ে একজন নারী শ্রমিক মাসে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিমাণ এবং আয়ও বাড়ার সুযোগ থাকে।

এই শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তর্জাতিক বাজার। পিবাড়িয়া গ্রুপের কারখানায় তৈরি পরচুলা বর্তমানে বিশ্বের ২২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, চিলি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, জার্মানি, ইতালি, জাপান, মাল্টা, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, সৌদি আরব, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক ও ইয়েমেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ১৮টি কারখানা থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলারের পরচুলা রপ্তানি করা হচ্ছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৪ কোটি টাকা।

পোড়াবাড়িয়ায় এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল তুলনামূলক ছোট পরিসরে। পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামানের বাড়িও এই গ্রামেই। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পরচুলা তৈরির কারখানা দেখে তিনি এই ব্যবসায় আগ্রহী হন। এরপর ২০০৭ সালে নিজের এলাকায় প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে একটি ছোট কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত পরচুলা সরবরাহ করা। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগ বিস্তৃত হয়ে এখন প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এই শিল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে গ্রামের নারীদের জীবনে। আগে যাদের অনেকেরই নিজ এলাকায় থেকে আয় করার সুযোগ ছিল না, তারা এখন পরিবার ও ঘরের কাজের পাশাপাশি উপার্জন করতে পারছেন। কারখানায় সরাসরি কাজ করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের কেউ কেউ বাড়িতে বসেও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের আয়ও বাড়ছে। অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি সক্ষমতা অর্জন করেছে।

গফরগাঁওয়ের এই উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও নারীদের কর্মসংস্থানের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানাটি প্রথমে নারীদের কাজ শেখায় এবং দক্ষতা অর্জনের পর তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়। কেউ কারখানায় এসে কাজ করেন, আবার সংসারের নানা দায়িত্বের কারণে অনেকে বাড়িতে থেকেও কাজ করার সুযোগ পান। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন থাকায় নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়াও সহজ হয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক আয়ের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামানের মতে, বিশ্বজুড়ে মানুষের চুল দিয়ে তৈরি উইগ ও হেয়ার সিস্টেমের বড় বাজার রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এর চাহিদা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশেও এই শিল্পকে আরও বড় করার সুযোগ রয়েছে। তার পরিকল্পনা, আগামী দিনে প্রায় ১০ হাজার নারীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। তবে এ জন্য কাঁচামাল আমদানি ও পরিবহন সহজ করা, জাহাজে পণ্য পাঠানোর খরচ ও সময় কমানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।

পোড়াবাড়িয়ার গল্প তাই শুধু একটি কারখানা কিংবা পরচুলা তৈরির গল্প নয়। ফেলে দেওয়া চুলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই শিল্প একই সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের জন্য তৈরি করেছে আয় ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ। শিরিন, সাথী কিংবা মাফিয়ার মতো বহু নারী নিজেদের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে বদলে দিচ্ছেন পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের ছোট্ট গ্রাম পোড়াবাড়িয়া, যেখানে মানুষের ফেলে দেওয়া চুল এখন অনেক নারীর জীবনে নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছে।

সূত্র: প্রথম আলো।

Advertisements