দুধ চা কি দুধের বিকল্প হতে পারে?

সকালের শুরুতে এক কাপ গরম চা অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। কারও পছন্দ লিকার চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া চায়ের কথা ভাবতেই পারেন না। এমনও অনেকে আছেন, যারা সরাসরি দুধ পান করতে পছন্দ করেন না, কিন্তু দিনে কয়েক কাপ দুধ চা পান করেন। তাদের মধ্যে একটি ধারণা কাজ করে—চায়ের সঙ্গে যেহেতু দুধ মেশানো হচ্ছে, তাই দুধের ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু দুধ, পানি ও চা পাতা একসঙ্গে ফুটিয়ে তৈরি করা চা থেকে শরীর আসলে কতটা পুষ্টি পায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দুধ গরম করলে এর সব পুষ্টিগুণ একেবারে নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ উপাদান সাধারণত তাপের কারণে পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে চায়ের সঙ্গে দুধ মেশানোর পর শরীরে এসব পুষ্টি উপাদান কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগতে পারে, সেটি নির্ভর করে চা ও দুধের উপাদানগুলোর পারস্পরিক প্রভাবের ওপর।
চা পাতায় ট্যানিন ও অক্সালেটের মতো যৌগ থাকে। এগুলো দুধের ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। ফলে দুধে ক্যালসিয়াম থাকার পরও শরীরের পক্ষে তার সবটুকু সহজে শোষণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই শুধু দুধ চা পান করলেই নিয়মিত দুধ পান করার সমান পুষ্টি পাওয়া যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
দুধে থাকা বিভিন্ন ভিটামিনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। দুধে ভিটামিন বি১২সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে দুধ, চা পাতা ও অন্যান্য উপকরণ একসঙ্গে উচ্চ তাপে ফুটিয়ে চা তৈরি করলে কিছু তাপ-সংবেদনশীল পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তবে কতটা পুষ্টি নষ্ট হবে, তা নির্ভর করে দুধের ধরন, রান্নার পদ্ধতি ও কতক্ষণ গরম করা হচ্ছে তার ওপর।

দুধের সঙ্গে চা মেশানোর ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় আলোচনায় আসে। চায়ে ক্যাটেচিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে, আর দুধে রয়েছে কেসিন নামের একটি প্রোটিন। কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, দুধের কেসিন চায়ের নির্দিষ্ট অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। এর ফলে চায়ের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কার্যকারিতা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দুধ চা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা চায়ের সব উপকারিতা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।
দুধ চায়ের ক্ষেত্রে হজমের বিষয়টিও অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চায়ে থাকা ক্যাফেইন কিছু মানুষের পাকস্থলীতে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে খালি পেটে ঘন দুধ চা পান করলে কারও কারও বুকজ্বালা, অম্বল, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। দুধে থাকা ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা হয় এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দুধ চা পান করার পর গ্যাস, পেট ব্যথা বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তবে দুধ চা মানেই যে শরীরের জন্য খারাপ, এমন ধারণাও ঠিক নয়। পরিমিত পরিমাণে দুধ চা অনেকের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয় যখন কেউ সরাসরি দুধের বিকল্প হিসেবে অতিরিক্ত পরিমাণে দুধ চা পান করতে থাকেন কিংবা চায়ে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করেন। কয়েক কাপ মিষ্টি দুধ চা পান করলেই দুধের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণ হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি পেতে দুধ বা দুধজাত খাবারকে নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ করা যেতে পারে। যারা দুধ পান করতে পারেন না বা পছন্দ করেন না, তারা দই, পনিরসহ অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার থেকেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারেন। অন্যদিকে চা পান করতে চাইলে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে পরিমিত পরিমাণে পান করাই ভালো।
সব মিলিয়ে দুধ চা মূলত একটি জনপ্রিয় পানীয়, একে দুধের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। চায়ের সঙ্গে কিছুটা দুধ যোগ করলেই এক গ্লাস দুধের সমান পুষ্টি শরীরে পৌঁছে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই দুধের পুষ্টিগুণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত দুধ চা পান না করে সুষম খাদ্যতালিকার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



