বন্যায় হাজার প্রাণহা’নি, ক্ষতিপূরণ চেয়ে চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নেপাল

ভয়াবহ বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু, হাজারো মানুষের নিখোঁজ হওয়া এবং বিপুল অবকাঠামোগত ক্ষতির পর জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে নেপাল। দেশটির অভিযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের ভূমিকা অত্যন্ত সামান্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে হিমালয়ঘেরা এই দেশটির ওপর। তাই বড় পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তা নয়, ক্ষতিপূরণ পাওয়াকে নিজেদের ন্যায্য অধিকার হিসেবে দেখছে কাঠমান্ডু।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। এতে নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুর্যোগে এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। ভয়াবহতার কারণে নেপাল এই দুর্যোগকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ নামেও অভিহিত করেছে।
‘এটি দান নয়, ন্যায়বিচার’
বন্যার পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, নেপাল খুব সামান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

খানালের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির জন্য নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে কেবল মানবিক সহায়তা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, শিল্পোন্নত ও বড় নির্গমনকারী অর্থনীতিগুলোর কারণে যে ক্ষতি তৈরি হচ্ছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নৈতিক ও আইনি দায় রয়েছে।
কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থানকে ‘সহায়তা’ পাওয়ার জায়গা থেকে ‘ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ’-এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, এটি দাতব্যের বিষয় নয়; বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
খানাল বিশেষভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। এসব দেশের কাছ থেকেই নেপালের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত বলে দাবি করছেন তিনি।
তবে বিষয়টি সরল নয়। মোট নির্গমনের পরিমাণে ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ নির্গমনকারী হলেও দেশটির মাথাপিছু ও ঐতিহাসিক কার্বন নির্গমন উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৪ সালের EDGAR হিসাব অনুযায়ী, মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু মাথাপিছু নির্গমনের চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে—ভারতে তা প্রায় ৩ টন CO₂-সমতুল্য, চীনে প্রায় ১১ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ টনের বেশি।
এই কারণেই ভারত দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান নির্গমন নয়, ঐতিহাসিক নির্গমন, মাথাপিছু নির্গমন, উন্নয়ন-প্রয়োজন এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে আগে সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর দায় বিবেচনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয়?
বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে বন্যার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক মূল্যায়নে পাথর ও বরফের ধস, অস্থিতিশীল হিমবাহ এবং হিমালয়ের পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্রকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহের গলন, পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এবারের বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক ঠিক কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
দুর্যোগের পর এই অঞ্চলে নির্মিত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভূমিকম্পপ্রবণ ও ভঙ্গুর হিমালয় এলাকায় সড়ক, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কতটা বাড়াচ্ছে, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুনর্গঠনে লাগতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলার
বন্যার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শুধু প্রাণহানি বা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
অর্থাৎ, একটি দুর্যোগ নেপালের মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির জন্য কতটা দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে, এই হিসাব থেকেই তার ধারণা পাওয়া যায়। জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য নেপাল ইতিমধ্যে জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির শিকার দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই ধরনের অর্থায়নের ব্যবস্থাই করা হয়েছে।
জাতিসংঘে উঠতে পারে ক্ষতিপূরণের দাবি
এবার নেপাল বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরও বড় মঞ্চে নিয়ে যেতে চাইছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এবং নেপালের ক্ষতিপূরণের দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। নেপালের অবস্থান তাই শুধু একটি ভয়াবহ বন্যার পর আর্থিক সহায়তা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং দেশটি প্রশ্ন তুলছে—যারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে তুলনামূলক বেশি অবদান রাখছে, জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষতি সামলানোর দায়িত্বও কি তাদের বেশি নেওয়া উচিত নয়?
হিমালয়ের পাদদেশে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয় সেই পুরোনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনেছে—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি যখন সীমান্ত মানে না, তখন এর দায় ও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ হবে?



