বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিবিধ

কিশোর শাহেদের খোঁজ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় , ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে আলোচনায় শাহেদ

WhatsApp Image 2026-09-02 at 5.26.49 PM

মাত্র ১৭ বছর বয়স। অথচ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রযুক্তিকে। মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পদে পদে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ থেকেই তৈরি করেছিল ‘ঘুষ.সাইট’। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সেই উদ্যোগে জমা পড়েছে হাজার হাজার অভিযোগ। এবার কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদের এই উদ্যোগের খোঁজ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনেছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও।

মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে শাহেদকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে কথা বলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। বৈঠকে ‘ঘুষ.সাইট’ কীভাবে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, শাহেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী এবং এ উদ্যোগে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন কি না—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

মায়ের পেনশন থেকেই শুরু

শাহেদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রয়াত মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পেনশনের টাকা ও অন্যান্য সরকারি পাওনা পেতে নানা পর্যায়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিবাদ জানাতেই গত ২১ আগস্ট ‘ঘুষ.সাইট’ নামে ওয়েবসাইটটি চালু করে শাহেদ।

ওয়েবসাইটটিতে সাধারণ মানুষ ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে জমা পড়তে থাকে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ। মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত সাইটটিতে মোট ১১ হাজার ৬৬৬টি অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৩৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে শাহেদের উদ্যোগের তথ্য।
শাহেদের এই উদ্যোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় আসে। সোমবার তাঁর বাবাকে ডেকে মায়ের পেনশনের কাগজপত্র দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

এরপর সোমবার বিকেলেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শাহেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

Advertisements

সরকারের সহযোগিতা চান শাহেদ

সিটি প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকের পর শাহেদ জানান, ‘ঘুষ.সাইট’-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং উদ্যোগটিকে কীভাবে আরও বড় পরিসরে নেওয়া যায়, মূলত তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার কীভাবে তাঁকে সহযোগিতা করতে পারে, সেটিও উঠে আসে বৈঠকে।

শাহেদ এখনো শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইটটি পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁর ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। তাই সরকারি পর্যায়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা স্বীকৃতি পেলে উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানান শাহেদ। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ‘ঘুষ.সাইট’ কীভাবে পরিচালনা করতে চান এবং মায়ের পেনশনের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। শাহেদের ভাষায়, সরকার তাঁর উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে—এমনটাই তাঁর মনে হয়েছে।

‘এমন তরুণদের উৎসাহিত করা দরকার’

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকনের কাছেও শাহেদের উদ্যোগটি ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শাহেদের মধ্যে সমাজের জন্য কিছু করার আগ্রহ ও উদ্যম রয়েছে। শুধু শাহেদ নয়, জেন-জির অনেক তরুণ-তরুণীই দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চান। তাঁদের এই আগ্রহকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা দরকার। প্রশাসক জানান, শাহেদের বক্তব্য ও ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। বিষয়টি সরকারের গবেষণা বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

শাহেদের অভিযোগ তদন্তে কমিটি

এদিকে শাহেদের মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা পেতে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ কুমার তরফদার ও মো. সাদ্দাম হোসেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ ‘ঘুষ.সাইট’-সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইতিমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তদন্তের নোটিশে বলা হয়েছে, আজমতপুর পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমেনা খাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী মো. শরীফুল ইসলাম কেন যৌথ বিমা, কল্যাণ ভাতা এবং দাফন-কাফনের অনুদান পাননি এবং বিষয়টি কেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়নি—এসব অভিযোগ তদন্ত করা হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণসহ নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

একজন কিশোরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’ এখন পৌঁছে গেছে হাজারো মানুষের অভিজ্ঞতার কাছে। ফলে শাহেদের উদ্যোগটি শুধু তাঁর নিজের প্রতিবাদের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সরকারি সেবায় ঘুষ ও অনিয়মের অভিজ্ঞতা প্রকাশের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং শাহেদের মতো তরুণদের অংশগ্রহণ দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে কতটা নতুন পথ তৈরি করতে পারে।

Advertisements