Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে ছেলের বিজ্ঞাপন, যা বললেন তারা

মা এমন একজন মানুষ, যিনি সন্তানের জন্য সবকিছুই করতে পারেন। নিজের সুখের কথা না ভেবে সন্তানের সুখের কথা ভাবাই নিজের কাজ বলে মনে করেন তিনি। সেখানে মায়ের জন্য যখন সন্তানের কিছু করার সুযোগ থাকে, সন্তানরা কেন করতে পারবে না?

একজন মা কিংবা বাবা সন্তানের বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলে কোনো কথা হয় না। কিন্তু যখন একজন সন্তান তার মায়ের বিয়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয়, তখন তাকে পড়তে হয় ট্রলের মুখে। সম্প্রতি মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে এক ছেলের দেওয়া বিজ্ঞাপন নিয়ে চলছে ট্রল। এই ট্রলের বিষয়টি সচেতন মহল দেখছে রুচির বিকৃতি হিসেবে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শবনম জান্নাত বলেন, ‘মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে ছেলে দেওয়া বিজ্ঞাপনের বিষয়টিকে আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছিল। কিন্তু মায়ের জন্য যে বিজ্ঞাপনে, যে শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে, তা না দিয়ে শুধু একটি ছবি দিয়েও বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতো। মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়াই যায়। সেখানে নেগেটিভ কিছু না বলাই ভালো। যারা বলছেন, এটা সমাজের জন্য অবক্ষয়, তা ভুল বলছেন। আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। ছেলের বয়স কম, তাই সে তার যা ভালো মনে হয়েছে, করেছে। কিন্তু বিষয়টিকে সামাজিক অবক্ষয় বলা উচিত নয়। এটি একটি বিয়ে। এখানে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রশ্ন উঠবে কেন?’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নূরানী জাহিদ সুমি বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। বিষয়টি দুভাবে প্রভাব ফেলে। প্রথমত, সাইকোলজিক্যাল প্রভাব; দ্বিতীয়ত আবেগপূর্ণ প্রভাব। এছাড়া লজিক্যাল দিক থেকে চিন্তা করলেও ঘটনাটা ইতিবাচকই নির্দেশ করে। যেটা আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। একজন মানুষের যখন সঙ্গী মারা যাবে, বিশেষ করে একজন নারীর যখন স্বামী মারা যাবে, তখন অনেকে আশা করেন যে, তিনি মা হিসেবে তার বাচ্চাদের নিয়েই বাকি সময়টা পার করে দেবেন। কিন্তু একজন সিঙ্গেল মায়ের কষ্ট যে কতখানি, তা কেউ বুঝতে চাইবে না। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে। একজন পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে সে ঠিকই নতুন বিয়ে করে সংসার করে। প্রশ্ন হলো, একজন মায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন কেন? আমি ছেলের উদ্যোগটির প্রশংসা করছি। কারণ সে বুঝেছে, তার মায়ের একজন সঙ্গী প্রয়োজন, তাই সে বিজ্ঞাপনটি দিয়েছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শাশ্বতী সরকার দিশা বলেন, ‘মা যদি ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজতে পারেন, তাহলে ছেলের মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলে দোষের কী? একটা সময়ের পর সবারই জীবনে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন পড়ে। আর বলা হয় যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরা একসময় মা বাবার শিশুর মতো হয়ে যায়, আর সন্তানরা হয়ে ওঠে তাদের অভিভাবক। তাহলে মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে ছেলে বিজ্ঞাপন দিতেই পারে।’

একজন মা কিংবা বাবা সন্তানের বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলে কোনো কথা হয় না। কিন্তু যখন একজন সন্তান তার মায়ের বিয়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয়, তখন তাকে পড়তে হয় ট্রলের মুখে। সম্প্রতি মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে এক ছেলের দেওয়া বিজ্ঞাপন নিয়ে চলছে ট্রল। এই ট্রলের বিষয়টি সচেতন মহল দেখছে রুচির বিকৃতি হিসেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রোদেলা শাহরিন আলম বলেন,‘বিষয়টা নিশ্চয়ই আমি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। প্রতিটি মানুষেরই জীবনসঙ্গী প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সঙ্গ প্রয়োজন৷ যখন তার সন্তানেরা নিজেরাই উপলব্ধি করেছে যে, তাদের দেওয়া সময় মায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। তখন অবশ্যই মায়ের জন্য জীবনসঙ্গী খোঁজার সাহসী পদক্ষেপটা দারুন। পরিবর্তন আসুক দৃষ্টিভঙ্গিতে।’

গভার্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্স রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এন্টাপ্রেনরশিপের শিক্ষার্থী আয়শা জাহানও মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়টিকে পজিটিভলি দেখেন। কারণ, সবারই একজন সঙ্গী প্রয়োজন হয়। কিন্তু যখন কোনো মহিলা ২য় বিয়ে নিয়ে ভাবতে যায়, তখন তাকে তার সন্তান সমাজ সবাইকে নিয়ে আগে ভাবতে হয়। আর এই জন্য সে হিনমন্মন্যতায় ভোগে। আমার মনে হয় তিনি একজন লাকি মা, যিনি তার সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছেন। ঘরে ঘরে এমন সন্তান দরকার, যারা বাবা-মায়ের চাহিদা ও তাদের সুখের কথা ভাবে।’

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী তানজিরিন রহমান তন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের দেশে ৩৩ শতাংশ মানুষই একাকিত্বে ভোগে। একটা সময় যখন পরিবারে সবাই থাকে কিন্তু বাবা কিংবা মা একা থাকেন, তখন তারা একাকিত্বে ভোগেন। তাই এই সময় যখন মা কিংবা বাবা একাকিত্বে ভোগেন, তখন তার একজন সঙ্গী প্রয়োজন। সংসারের নানান কাজের জন্যও মা-বাবা দুজনেরই প্রয়োজন। তাই এই সময় মায়ের কিংবা বাবার সঙ্গী প্রয়োজন। আর মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া নিয়ে যে ট্রল চলছে, তা রুচির বিকার মাত্র। আমার কথা হলো, একজন ছেলে তার মায়ের জন্য সঙ্গী খুঁজলে ক্ষতি কিসে? ছেলেরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে মা’কে সময় দেওয়া হয়ে উঠবে না। তাই সে তার মায়ের জন্য একজন সঙ্গী চেয়েছে। বিষয়টি প্রশংসনীয়। কারণ একজন সিঙ্গেল মায়ের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে না কাউকে প্রয়োজন।’

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান সুমাইয়া বলেন, ‘মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে ছেলের বিজ্ঞাপন বিষয়টি আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়। জীবনে চলার পথে একজন জীবন সঙ্গী সবসময় প্রয়োজন হয়। একটা বয়স পর যখন সন্তান বড় হয় এবং বয়স বাড়ে তখন বন্ধু, সন্তান সবার সঙ্গেই দূরত্ব বেড়ে যায়। ওই সময় ওই মানুষটি একাকীত্বে ভোগে। এই একাকীত্ব সময়টি শুধু পাশে থাকে তার সারাজীবনের পথচলার সঙ্গী। তাই পুরুষ হোক বা মহিলা এই সময়টাই তার পাশে তার সঙ্গীকে বেশি প্রয়োজন। আমাদের সমাজ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বামী আবার বিয়ে করলে সেটা তার এ জন্য প্রয়োজন বলে মনে করি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর একজন স্ত্রীর আবার বিয়ে করলে তা খুব একটা ভালো চোখে দেখি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে যে ছেলে, আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। কারণ সে তার মাকে বুঝেছে। এই মাও একজন গর্বিত মা। কারণ তিনিও তার ছেলেকে সুশিক্ষা দিয়ে বড় করছেন।

অনন্যা/এআই