ধর্ম নয়, মানুষই আগে—শাবানা আজমি

ধর্মের পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিচার করার পরিবর্তে তার চিন্তা, মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত—এমন বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ করে আসছেন বলিউডের অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও তার স্বামী, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার। ধর্মীয় বিভাজন ও উগ্রতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাদের বিভিন্ন সময় সমালোচনা ও আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়েছে। তবে এসব অভিজ্ঞতা তাদের নিজেদের বিশ্বাস থেকে সরাতে পারেনি।

সম্প্রতি জুমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ও জাভেদ আখতারের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন শাবানা আজমি। তিনি জানান, বিভিন্ন ধর্মের উগ্রপন্থীদের কাছ থেকেই তারা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। কখনো তাদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো তাদের কাছে ফতোয়াও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসব চাপ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি।
শাবানার মতে, সমাজের বিভাজনকে শুধু হিন্দু-মুসলমানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আসল বিষয়টি বোঝা যায় না। তার কাছে মূল পার্থক্যটি হলো উদারপন্থী ও উগ্রপন্থী চিন্তার মধ্যে।
তিনি মনে করেন, একজন উদারপন্থী হিন্দু ও একজন উদারপন্থী মুসলমানের মধ্যে চিন্তা ও মূল্যবোধের অনেক মিল থাকতে পারে। একইভাবে ধর্ম আলাদা হলেও উগ্রপন্থী মানসিকতার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি জরুরি।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই ভারতের শক্তি
ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে গিয়ে মানুষকে দেখার পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে শাবানা বলেন, তিনি এমন একটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করেন যেখানে নানা ধর্ম, সম্প্রদায় ও মতের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন।
তার মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর বৈচিত্র্য। ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যে সহাবস্থানের ঐতিহ্য তৈরি করেছেন, সেটিকে সম্মান করা প্রয়োজন। ধর্মীয় বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত সমাজের লক্ষ্য।

সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নিয়েও কথা বলেন এই অভিনেত্রী।
সিনেমাতেও কি বদলে গেছে দৃষ্টিভঙ্গি?
আলোচনায় উঠে আসে ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’ ছবির প্রসঙ্গ। ছবিটিতে সানি দেওল একজন মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে সিনেমাটি দর্শকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পায়নি। শাবানার ধারণা, বর্তমান সময়ে তৈরি হওয়া ধর্মীয় বিভাজনের পরিবেশের সঙ্গে ছবিটির দর্শক প্রতিক্রিয়ার কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।
নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অতীতের হিন্দি সিনেমার উদাহরণও দেন। তার মতে, একসময় কোনো অভিনেতা কোন ধর্মের চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে এতটা মাথাব্যথা ছিল না। অভিনেতারা অনায়াসে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতেন এবং দর্শকরাও সেটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করতেন।
এ প্রসঙ্গে অমিতাভ বচ্চনের অভিনীত ‘কুলি’ ছবির কথা উল্লেখ করেন শাবানা। ওই সিনেমায় অমিতাভ একজন মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। একইভাবে ‘দিওয়ার’ ছবিতেও তার চরিত্রের সঙ্গে ‘৭৮৬’ সংখ্যাটির একটি বিশেষ সম্পর্ক ছিল। সে সময় এসব বিষয় নিয়ে দর্শকদের মধ্যে বড় ধরনের আপত্তি তৈরি হয়নি।

শাবানার প্রশ্ন, সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনায় কি এমন পরিবর্তন এসেছে যে একজন অভিনেতা কোন ধর্মের চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে?
তার মতে, একজন শিল্পী কোন চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেটিকে তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত নয়। একজন অভিনেতার কাজ হলো চরিত্রকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা। চরিত্রের ধর্ম ও শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিচয়কে এক করে দেখা সমাজের জন্য ইতিবাচক কোনো ফল বয়ে আনবে না।
ধর্ম নয়, মানুষই পরিচয়ের মূল
নিজেদের বিশ্বাসের কথা বলতে গিয়ে শাবানা আজমি জানান, তিনি ও জাভেদ আখতার ধর্মকে মানুষের পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে দেখেন না। তাদের কাছে একজন মানুষের চিন্তাধারা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং অন্য মানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তারা বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি হুমকি ও নানা ধরনের চাপের মুখেও পড়েছেন। কিন্তু শাবানার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অভিজ্ঞতা তাদের বিশ্বাসকে দুর্বল করেনি।
বরং তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে—মানুষকে ধর্মের পরিচয়ে ভাগ করার বদলে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে দেখার প্রয়োজন।

শাবানা মনে করেন, ধর্মীয় পরিচয় একজন মানুষের জীবনের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। একজন মানুষ কেমন চিন্তা করেন, অন্যের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল এবং সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ কেমন—এসব বিষয় দিয়েই তার প্রকৃত মানবিক পরিচয় অনেক বেশি স্পষ্ট হয়।
তার ও জাভেদ আখতারের অবস্থান তাই মূলত বিভাজনের বিপরীতে সহাবস্থানের পক্ষে। ধর্মের পার্থক্যকে কেন্দ্র করে দূরত্ব তৈরির বদলে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা এবং একে অপরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোর মধ্যেই একটি বহুত্ববাদী সমাজের শক্তি নিহিত—এমন বার্তাই দিয়েছেন শাবানা আজমি।



