বাজারে ছেঁড়া টাকার দাপট, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

পুরোনো ও জীর্ণ নোটে বাড়ছে ভোগান্তি। দোকান থেকে মেট্রোরেল, এমনকি ব্যাংকের সিআরএমেও বাতিল হচ্ছে নোট। নতুন নোটের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পুরোনো নোটই কেন ঘুরছে বাজারে?
টাকাটা হাতে নিয়েই বিপাকে পড়তে হলো তাঁকে। স্বজনের চিকিৎসার খরচ মেটাতে জরুরি ভিত্তিতে বাড়িতে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি ব্যাংক শাখায় গিয়েছিলেন এক বেসরকারি চাকরিজীবী। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এক লাখ টাকার কম জমা দিতে হলে ব্যবহার করতে হয় ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন বা সিআরএম।
৫০০ টাকার ১০০টি নোট মেশিনে ঢোকানোর পর দেখা গেল, ৩৬টি নোটই গ্রহণ করছে না সিআরএম। কারণ—নোটগুলো অতিরিক্ত পুরোনো ও জীর্ণ। অথচ মজার বিষয় হলো, এসব নোট তিনি কিছুদিন আগেই কাছের আরেকটি ব্যাংক থেকে তুলেছিলেন।
একজন মানুষের এই অভিজ্ঞতা আসলে বড় একটি বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। দেশের বাজারে এখন ঘুরছে বিপুলসংখ্যক ছেঁড়া, ফাটা, ময়লা ও জীর্ণ নোট। এসব নোট দিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যেমন বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, তেমনি সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররাও। নোটের বয়স বেড়ে গেলে তার মূল্য কমে যায় না। কিন্তু বাস্তবে পুরোনো নোট হাতে থাকা মানেই অনেক সময় নতুন ঝামেলার মুখোমুখি হওয়া।
দোকানে গিয়ে দেখা যায়, অল্প ছেঁড়া নোটও নিতে চাইছেন না বিক্রেতা। কোথাও নোটের একটি অংশ ছেঁড়া থাকলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আবার মেট্রোরেলের টিকিট কাটতে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় মেশিন ফিরিয়ে দিচ্ছে পুরোনো নোট। ব্যাংকের সিআরএমেও একই ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকার কম জমার ক্ষেত্রেও সিআরএম ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে যাঁদের হাতে পুরোনো নোট রয়েছে, তাঁদের জন্য সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। হাতে থাকা টাকা বদলে নতুন নোট সংগ্রহ করার সুযোগ বা সময় সবসময় থাকে না। ফলে পুরোনো নোট নিয়েই বাজারে যেতে হয়। আর তখনই শুরু হয় দর-কষাকষি, প্রত্যাখ্যান কিংবা ভোগান্তি।
কেন কমছে নতুন নোটের সরবরাহ?
বাংলাদেশের বর্তমান নোটসংকটের পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে নোটের নকশা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক নোটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর পুরোনো নকশার নোট ছাপানো বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে থাকা ওই নকশার নোটও বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। নতুন নকশার নোট তৈরি, অনুমোদন এবং ছাপার প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেই বাজারে নতুন নোটের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে মানুষের হাতে থাকা পুরোনো নোটই বারবার লেনদেনে ফিরে আসতে থাকে। বর্তমানে নতুন নকশার নোট বাজারে ছাড়া শুরু হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ এখনো কম বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে।
টাকা ছাপানোও সহজ কাজ নয়
অনেকের ধারণা, প্রয়োজন হলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে দিতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। দেশে ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার ব্যাংক নোট ছাপানোর দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। এসব নোটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর থাকে। আর ১, ২ ও ৫ টাকার নোট সরকারি নোট হিসেবে পরিচিত। এসব নোটে অর্থসচিবের স্বাক্ষর থাকে। দুই ধরনের নোটই ছাপানোর কাজ অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকই করে। নোট তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা কাগজ, ইনট্যালিও কালি, নিরাপত্তা সুতা ও বিভিন্ন রাসায়নিক। এসব উপকরণের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এসব উপকরণ সংগ্রহ করে। বর্তমানে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, ইতালি ও ইন্দোনেশিয়ার আটটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে। কাঁচামাল হাতে আসার পরও নোট ছাপতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। কারণ, দেশের টাঁকশাল হিসেবে পরিচিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সক্ষমতা সীমিত।
ছাপার খরচও বাড়ছে
নোটের কাগজ, কালি, নিরাপত্তা উপকরণসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এর ফলে প্রতিটি নোট ছাপানোর খরচও বেড়েছে। তবে মোট ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবসময় একই চিত্র দেখা যায়নি, কারণ প্রয়োজন অনুযায়ী ছাপানো নোটের পরিমাণও পরিবর্তিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে নোট ছাপাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৩৫ কোটি টাকায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনিরীক্ষিত হিসাবে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি নোট ছাপানো হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারত।
২ ও ৫ টাকার নোটেও পরিবর্তন
ছোট মূল্যমানের নোট নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ২ ও ৫ টাকার কাগুজে নোট ছাপানো বন্ধ রয়েছে। এর পরিবর্তে এসব মূল্যমানের ধাতব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখানেও রয়েছে আরেক বাস্তবতা। ব্যাংকের ভল্টে থাকা ধাতব মুদ্রা নিতে গ্রাহকদের অনীহা রয়েছে। একইভাবে ব্যাংকগুলোরও এসব মুদ্রা নিয়ে আগ্রহ কম। ফলে কাগুজে নোট থেকে ধাতব মুদ্রায় যাওয়ার প্রক্রিয়াটিও খুব মসৃণ নয়।
ভোগান্তির শেষ কোথায়?
রাজধানীর মিরপুরের ১৪ নম্বর এলাকায় ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রি করেন রমিজুল ইসলাম। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে টাকা নেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতাও একই।
রমিজুলের ভাষায়, অনেক সময় ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া ছেঁড়া টাকা পাইকারি বিক্রেতারা নিতে চান না। তখন সেই নোট নিয়ে তাঁকেই বিপাকে পড়তে হয়। আরও বড় সমস্যা হলো—কোথায় গিয়ে এসব টাকা বদলানো যাবে, সেটিও তিনি জানেন না।
এই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ—একটি নোটের বয়স বেড়ে গেলে সেটি যদি বাজারে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নোটের দায়িত্ব নেবে কে? টাকার মূল্য নির্ধারিত হয় তার গায়ে লেখা অঙ্ক দিয়ে। কিন্তু সেই টাকা যদি দোকানদার না নেন, মেশিন গ্রহণ না করে কিংবা ব্যাংকের লেনদেনেও বাধা তৈরি হয়, তাহলে মানুষের কাছে সেটি কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।
নতুন নোট ছাপানো, পুরোনো ও অচল নোট দ্রুত বাজার থেকে তুলে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে ছেঁড়া নোট বদলের সহজ সুযোগ করে দেওয়া—এই তিনটি বিষয় কার্যকরভাবে সমাধান করা না গেলে পকেটে টাকা থাকার পরও ভোগান্তির এই গল্প চলতেই থাকবে।



