পরিচ্ছন্ন শহরের নেপথ্যের মানুষ, তাঁদের নিরাপত্তা কতটা ভাবি আমরা? আপনার একটুখানি সচেতনতাই বাঁচাতে পারে পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে

সকালের ব্যস্ততা। কেউ অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতিতে, কেউ ছুটছেন ক্লাসে। রান্নাঘরের কাজ শেষ করে কেউ হয়তো এক হাতে খাবারের ব্যাগ, অন্য হাতে ময়লার ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিনের এই ছোট্ট কাজটি আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক—ঘরের আবর্জনা বাইরে রেখে দেওয়া। কিন্তু আমরা যে ময়লাটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বাইরে সরিয়ে দিই, সেটিই এরপর আরেকজন মানুষের হাতে ওঠে। তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আমাদের ঘর, ভবন ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে যাঁরা প্রতিদিন নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যের সংস্পর্শে আসেন।
আমাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার ধরন এক নয়। খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক, কাচ, ধাতু, ব্যবহৃত ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, চিকিৎসাসামগ্রী, রাসায়নিকের বোতল—সবই গিয়ে মিশতে পারে একই ময়লার ব্যাগে। আর এই মিশ্র বর্জ্যই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজকে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

আপনার অসতর্কতা, অন্যের আঘাত
অনেক ক্ষেত্রেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করেন। ফলে ময়লার ব্যাগে থাকা কোনো ভাঙা কাচ, মাছের কাঁটা, ধাতব টুকরা কিংবা ধারালো বস্তু তাঁদের হাতে-পায়ে আঘাত করতে পারে। আরও বিপজ্জনক হতে পারে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা অন্য কোনো সুচালো চিকিৎসাসামগ্রী। ময়লার স্তূপের মধ্যে থাকা এমন কোনো বস্তু না দেখেই হাতে উঠে এলে ত্বক ফুটে যেতে পারে। বর্জ্যটি দূষিত হলে আঘাতের সঙ্গে সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই ময়লা ফেলার সময় ‘আমি তো ফেলে দিয়েছি, এরপর যা হওয়ার হোক’—এমন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
ময়লার ব্যাগে শুধু ময়লা থাকে না
বাসাবাড়ির বর্জ্যে থাকা কিছু জিনিসে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকসহ নানা ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। প্রস্রাব বা রক্তে ভেজা বর্জ্য, ব্যবহৃত ডায়াপার, স্যানিটারি পণ্য কিংবা কাঁচা মাংসের অবশিষ্টাংশের মতো জিনিস সরাসরি হাতে লাগলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীর হাতে আগে থেকেই কোনো কাটা বা ক্ষত থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। আবার ময়লা হাতে লেগে সেখান থেকে চোখ, মুখ বা শরীরের অন্য অংশে পৌঁছালেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। দূষিত ধারালো বা সুচালো বর্জ্যের আঘাতে ধনুষ্টঙ্কারের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোনো ধারালো বস্তু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে এসে থাকলে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি বা এইচআইভির মতো রক্তবাহিত সংক্রমণের আশঙ্কাও পরিস্থিতিভেদে তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, ময়লা ফেলার একটি ছোট ভুল কখনো কখনো অন্য একজন মানুষের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
ময়লার ব্যাগ বাঁধলেই দায়িত্ব শেষ নয়
আমাদের দেশে বর্জ্য আলাদা করে ফেলার অভ্যাস এখনো সর্বত্র গড়ে ওঠেনি। ফলে একই ব্যাগে খাবারের উচ্ছিষ্টের সঙ্গে কাচ, প্লাস্টিক, ধাতু কিংবা চিকিৎসাবর্জ্য ঢুকে যায়। পরে এসব আলাদা করার সময়ই বিপদে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতার শুরু হওয়া উচিত আমাদের নিজেদের ঘর থেকেই। প্রথমত, ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। ময়লার ব্যাগের মুখ ভালোভাবে আটকে দেওয়া উচিত, যাতে বহনের সময় ভেতরের বর্জ্য ছড়িয়ে না পড়ে।
ধারালো বা সুচালো জিনিস—যেমন ইনসুলিন সিরিঞ্জ, ভাঙা কাচ, ধাতব টুকরা, টিউবলাইট বা বাল্ব—সরাসরি ময়লার ব্যাগে না ফেলাই নিরাপদ। সম্ভব হলে এগুলো শক্ত প্লাস্টিকের কনটেইনারে রেখে মুখ শক্তভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। কনটেইনারটি এমনভাবে টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে, যাতে বাইরে থেকে কোনো ধারালো অংশ বেরিয়ে না থাকে। ছোট কোনো ধারালো বর্জ্য হলে পুরু কাপড়ে মুড়িয়ে শক্ত করে বেঁধেও রাখা যেতে পারে।
ব্যক্তিগত বর্জ্যে চাই বাড়তি সতর্কতা
ব্যবহৃত ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, কনডম কিংবা পোষা প্রাণীর মলমূত্র সরাসরি ময়লার ব্যাগে না দিয়ে আগে কাগজে ভালোভাবে মুড়িয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া ভালো। এতে বর্জ্যের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমে। কীটনাশক, শক্তিশালী পরিষ্কারক বা অন্য কোনো রাসায়নিকের ফাটা বোতল কিংবা মোড়কও আলাদা করে নিরাপদভাবে মুড়িয়ে ফেলতে হবে। বোতল অক্ষত থাকলে তার মুখ শক্ত করে বন্ধ করে তারপর ফেলতে হবে। ওষুধের বোতল বা প্যাকেটের ক্ষেত্রেও একইভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।
রান্নাঘরের পচনশীল বর্জ্য আলাদাভাবে মুড়িয়ে মুখ বন্ধ করে ফেললে দুর্গন্ধ, তরল ছড়িয়ে পড়া এবং জীবাণুর বিস্তার কিছুটা কমানো যায়। ব্যাটারিও অন্যান্য বর্জ্য থেকে আলাদা করে ফেলা ভালো।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর নিরাপত্তা মানে আমাদেরও দায়িত্ব

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু সিটি করপোরেশন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। একজন নাগরিক হিসেবে আমরা ময়লা কীভাবে ফেলছি, সেটিও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে মানুষটি আমাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনা হাতে তুলে নেন, তিনি কোনো যন্ত্র নন। তাঁরও পরিবার আছে, সন্তান আছে, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনের অধিকার আছে।
তাই পরেরবার ময়লার ব্যাগটি হাতে নেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড থামুন। ভেতরে কোনো কাচ আছে কি না, কোনো সুচ বা ধারালো বস্তু আছে কি না, বর্জ্যটি ভালোভাবে মোড়ানো হয়েছে কি না—একবার দেখে নিন।কারণ আপনার কাছে এটি হয়তো কয়েক মিনিটের একটি গৃহস্থালি কাজ। কিন্তু সামান্য অসতর্কতাই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য হয়ে উঠতে পারে গুরুতর আঘাতের কারণ। পরিচ্ছন্ন শহর চাই—তবে সেই পরিচ্ছন্নতার পেছনে থাকা মানুষগুলোর নিরাপত্তার কথাও মনে রাখতে হবে।



