প্রেমের সিনেমা বন্ধ চেয়ে নোটিশ, সেই আইনজীবীর পছন্দ অ্যাডাল্ট সিনেমা

দেশের নাটক ও সিনেমায় প্রেম-রোমান্সনির্ভর গল্পের আধিক্য নিয়ে আপত্তি তুলে এসব কনটেন্ট নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধে সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। তার এই পদক্ষেপ ঘিরে ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
এর মধ্যেই আইনজীবীর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া কয়েকটি পোস্ট সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার পোস্টগুলোতে বিভিন্ন সিনেমা দেখার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রোমান্টিক এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত ‘আর-রেটেড’ সিনেমাও রয়েছে।
ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ভারতের রোমান্টিক ড্রামা সিনেমা ‘রাধে শ্যাম’ দেখার কথা জানিয়েছিলেন মাহমুদুল হাসান মামুন। একই বছরের ৯ মে হলিউডের রোমান্টিক ফ্যান্টাসি অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা ‘স্টারডাস্ট’ দেখার বিষয়েও পোস্ট করেছিলেন তিনি।
এ ছাড়া ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ডিক্টেটর’ সিনেমাটি দেখার তথ্যও তার ফেসবুক পোস্টে রয়েছে। সিনেমাটি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য নির্ধারিত ‘আর-রেটেড’ চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিত।
এ ছাড়া তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে ব্যক্তিগত ভ্রমণের ছবিও দেখা যায়। ভারতের দিল্লিতে গিয়ে তাজমহলের সামনে তোলা ছবিও পোস্ট করেছেন তিনি।
এসব পোস্ট সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশ তার আইনি নোটিশের উদ্দেশ্য ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, রোমান্টিক সিনেমা দেখার আগ্রহ প্রকাশের পর দেশের নাটক-সিনেমায় প্রেম ও রোমান্সনির্ভর গল্পের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি পরস্পরবিরোধী কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার কেউ কেউ তার এই পদক্ষেপকে জনসমক্ষে আলোচনায় আসার কৌশল হিসেবেও দেখছেন।
যে কারণে আইনি নোটিশ
দেশের সাম্প্রতিক নাটক ও সিনেমায় প্রেম ও রোমান্সকেন্দ্রিক গল্পের আধিক্য নিয়ে আপত্তি তুলে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জনস্বার্থে আইনি নোটিশ পাঠান মাহমুদুল হাসান মামুন। নোটিশটি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চলচ্চিত্র ও নাটকে প্রেম ও রোমান্সনির্ভর কনটেন্টের সংখ্যা বেড়েছে। আইনজীবীর দাবি, এর ফলে দেশের সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার থেকেও মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু নাটক ও চলচ্চিত্রে পরকীয়া এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপনের বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের উপস্থাপনা পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক নৈতিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সমাজে নৈরাজ্য ও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে নিজের বক্তব্যের পক্ষে সংবিধানের ২১(১), ২৩ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন মাহমুদুল হাসান মামুন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকলেও শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ২৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
নোটিশে শুধু প্রেম-রোমান্সকেন্দ্রিক নাটক ও সিনেমা নির্মাণ এবং সম্প্রচারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি নয়, বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে তা জানাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট পিটিশন করা হবে বলেও নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে আইনি নোটিশে উত্থাপিত যুক্তি এবং আইনজীবীর ব্যক্তিগতভাবে সিনেমা দেখার বিষয়টি—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিকতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।



