বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

পরিবারের সঙ্গে খাবার খেলে কমে হতাশা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি: গবেষণা

পরিবারের সঙ্গে খাবার খেলে কমে হতাশা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি: গবেষণা

নিউক্লিয়াস ফ্যামিলি বা একক পরিবারের সংখ্যা যখন বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ঠিক তখনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ‘সলো ইটার’ বা একা একা খাবার গ্রহণকারীর সংখ্যা। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস মানসিক জগতে জন্ম দিতে হতাশার।

দীর্ঘদিন একা একা খাবার গ্রহণের এমন অভ্যাস নিয়ে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। মানসিক হতাশার পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে গবেষণা। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পায়।

গবেষণা অনুযায়ী, একসঙ্গে বসে আহার করার সামাজিক রীতি বা ‘কমেনসালিটি’ কেবল মন ভালো রাখে না, বরং এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মস্তিষ্কের ক্ষয়রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি একাধিক বৈশ্বিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিচিত মানুষদের নিয়ে একসঙ্গে খাদ্য গ্রহণ মানুষের হতাশা বা ডিপ্রেশন কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মেধার বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

গবেষকদের মতে, মানুষের সামাজিক জীবনে খাবারের ভূমিকা অনেক গভীর। খাবারের টেবিল শুধু পেট ভরানোর জায়গা নয়; এটি যোগাযোগ, সম্পর্ক তৈরি, আস্থা এবং পারস্পরিক বন্ধন গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও আচরণবিজ্ঞানের অধ্যাপক জান-এমানুয়েল দে নেভের মতে, একসঙ্গে খাবার খাওয়া মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আর সেই সামাজিক যোগাযোগের প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক সুস্থতার ওপরও।

পরিবারের সঙ্গে খাওয়া কী হতাশা কমায়?

Advertisements

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এক সঙ্গে খাবার খাওয়া এবং খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে। জেজিয়াং প্রভিনশিয়াল সেন্টারের গবেষক জেনয়ি ওয়াং চীনে ৬০ বছর এবং তার বেশি বয়সি ৯ হাজার ৩৬১ জন নারীর ওপর গবেষণা করেছেন।

গবেষণার রিপোর্ট অনুসারে, যারা একা একা খাবার খান তারা সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভোগেন। গবেষণাকালে অংশগ্রহণকারী নারীদের অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত দিক কিংবা একাকিত্বের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরেও ফলাফল অপরিবর্তিত ছিলো।

আবার অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫-৭৪ বছর বয়সি বৃদ্ধরা তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও একা একা খাবার খান। তাদের মধ্যে হতাশায় ভোগার ঝুঁকি যারা নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে খায় তাদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি।

খাবার ভাগাভাগি করে খেলে আত্মতৃপ্তি বাড়ে

ওয়াল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের তথ্য অনুসারে, খাবার এক সঙ্গে এবং ভাগাভাগি করে খেলে সম্পর্কের ভীত মজবুত হয়। ২০২৪ সালের এক রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী, গবেষকরা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছে তারা গত এক সপ্তাহে পরিবারের কিংবা পরিচিত কারো সঙ্গে দুপুরের লাঞ্চ বা রাতের ডিনার করেছে কিনা।

ফলাফলে দেখা যায়, যারা নিয়মিত কারো সঙ্গে খেয়েছেন তারা মানসিকভাবে অন্যদের তুলনায় সুস্থ রয়েছেন। তবে গবেষণায় এটি পুরোপুরিভাবে প্রমাণিত নয় যে, শুধুমাত্র একসঙ্গে খাবার খেলেই ডিপ্রেশন কিংবা একাকিত্ব দূর করা সম্ভব। খাবার একসঙ্গে এবং ভাগাভাগি করে খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়, আত্মতৃপ্তি আসে।

ভালো সঙ্গ খাবারের টেস্ট আরো বাড়িয়ে দেয়

একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সুফল কেবল মানসিক সুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল আর্থোপোলজিস্ট রবিন ডানবারের মতে, খাবার খাওয়ার সময় শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ নামক এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হতে পারে। এই পদার্থটি সুখ ও সন্তুষ্টির অনুভূতি জাগায়। এবং মানুষের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করতে সাহায্য করে।

পেনিসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিকা বুথবি এবং তার সহযোগী অন্য আরেকটি গবেষণায় আবিষ্কার করেন অন্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে চকলেট খেলে সেটি মানসিক ভাবে আরোও উপভোগ্য করে তোলে।

যে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি একে অপরের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়

বিশ্বজুড়ে সবাই মিলে বা একত্রে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাসের ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরণের পার্থক্য দেখা যায়। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপানে সপ্তাহে চার বারেরও কম মানুষ একসঙ্গে খাবার খায়, আমেরিকায় ৭-৮ বার এবং ইতালিতে তা ৯ বারেরও বেশি। ইতালিতে পারিরারিক এবং সামাজিকভাবে সবচেয়ে বেশি এক সঙ্গে খাবার খাওয়ার জন্য গভীরভাবে সংযুক্ত।

দিন দিন পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। কেউ ব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে খায় না কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে একা একা খায়; গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। আমাদের উচিত মানসিকভাবে সুস্থ্য থাকতে,একাকিত্ব দূর করতে এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে কারোর না কারোর সঙ্গে বসে নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা।

Advertisements