পোষা প্রাণীর আদর কি স্ট্রেস কমায়? গবেষণায় মিলল নতুন তথ্য

দিনটা খারাপ গেছে। কাজের চাপ, ব্যক্তিগত ঝামেলা কিংবা কোনো দুশ্চিন্তায় মন ভার হয়ে আছে। এমন সময়ে ঘরে ফিরে পোষা কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া কিংবা প্রিয় বিড়ালটিকে কোলে নেওয়া অনেকের কাছেই স্বস্তির মুহূর্ত। পোষা প্রাণীর সঙ্গে কিছু সময় কাটালেই যেন মনটা একটু হালকা হয়ে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোষা প্রাণী কি সত্যিই মানসিক চাপ কমায়? নাকি বিষয়টি পরিস্থিতি ও প্রাণীর আচরণের ওপর নির্ভর করে?

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই প্রশ্নের বেশ গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশা সাধারণ সময়ে মানুষের ইতিবাচক অনুভূতি বাড়াতে এবং নেতিবাচক অনুভূতি কমাতে পারে। তবে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মুহূর্তে পোষা প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশা সেই চাপ কমিয়ে দেয়—এমন প্রমাণ গবেষকেরা পাননি। বরং বিড়ালের ক্ষেত্রে একটি অপ্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেছে।
প্রায় ৮ হাজার মুহূর্তের তথ্য থেকে গবেষণার ফল
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Frontiers in Psychology-তে। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের ১৮৮ জন কুকুর ও বিড়াল মালিক এতে অংশ নেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের পাঁচ দিন ধরে দিনে সর্বোচ্চ ১০ বার বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে প্রশ্ন করা হয়।
প্রতিবার তাঁদের বর্তমান মেজাজ, মানসিক চাপ, কী করছিলেন এবং সেই মুহূর্তে পোষা প্রাণীর সঙ্গে কী ধরনের মিথস্ক্রিয়া হচ্ছিল—এসব তথ্য নেওয়া হয়। এভাবে গবেষকেরা প্রায় ৮ হাজারের কাছাকাছি বাস্তব সময়ের রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। ফলে শুধু ‘পোষা প্রাণী থাকলে ভালো লাগে কি না’—এমন সাধারণ প্রশ্নের বদলে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে মানুষের অনুভূতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটালে কি মন ভালো হয়?
গবেষণার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, হ্যাঁ—সাধারণ পরিস্থিতিতে পোষা প্রাণীর সঙ্গে বেশি মেলামেশার সঙ্গে ভালো অনুভূতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যে মুহূর্তগুলোতে মানুষ তাদের পোষা প্রাণীর সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করছিলেন, সেসব সময়ে তাঁদের ইতিবাচক অনুভূতি তুলনামূলক বেশি এবং নেতিবাচক অনুভূতি তুলনামূলক কম ছিল।
এখানে কুকুর ও বিড়ালের মধ্যে খুব বড় পার্থক্যও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ শুধু কুকুরই মানুষের মন ভালো করে, আর বিড়াল তা পারে না—এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাটি সমর্থন করে না। দুই ধরনের প্রাণীর সঙ্গেই মেলামেশার ক্ষেত্রে মানুষের ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। গবেষণাটি মূলত সম্পর্ক বা association দেখিয়েছে; এটি এমনভাবে পরিচালিত হয়নি যে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, ‘পোষা প্রাণীকে আদর করলেই মানুষের মন ভালো হয়ে যায়।’ বরং ভালো লাগার মুহূর্তে মানুষ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই পোষা প্রাণীর কাছে বেশি যাচ্ছে—এমন সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
কিন্তু মানসিক চাপের সময় কী ঘটে?
এখানেই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, কোনো মানুষ যখন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তখন পোষা প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশা সেই চাপের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে কি না।
ফলাফল ছিল—সাধারণভাবে এমন কোনো ‘stress-buffering’ প্রভাব পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ পোষা প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশা স্বাভাবিক সময়ে ভালো অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলেও, প্রচণ্ড চাপের কোনো ঘটনা ঘটার পর সেই চাপের নেতিবাচক প্রভাবকে কুকুর বা বিড়ালের সঙ্গে মেলামেশা নির্ভরযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়নি।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। কারণ ‘পোষা প্রাণীর সঙ্গে থাকলে মন ভালো লাগে’ এবং ‘পোষা প্রাণী মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকায়’—দুটি একই দাবি নয়।

বিড়াল নিয়ে কেন চমকপ্রদ ফল?
গবেষণার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেছে বিড়ালের ক্ষেত্রে।
ঘটনাজনিত মানসিক চাপের সময় বিড়ালের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করলে মানুষের নেতিবাচক অনুভূতি কমার বদলে স্ট্রেস ও নেতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার একটি প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে এটিকে এমনভাবে বলা যাবে না যে ‘বিড়াল মানসিক চাপ বাড়ায়’। গবেষকেরা নিজেরাও এই ফলাফলকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ বিড়াল মালিকদের নমুনা তুলনামূলক ছোট ছিল এবং সব বিশ্লেষণে একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি। তাই এই একটি গবেষণার ভিত্তিতে বিড়ালকে মানসিক চাপ বাড়ানো প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
তাহলে বিড়ালের ক্ষেত্রে এমন ফল কেন?
এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি।
গবেষকদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, বিড়ালের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়া অনেক সময় তুলনামূলক শান্ত ও কম সক্রিয় হয়। মানসিক চাপের মুহূর্তে একজন মানুষ হয়তো সক্রিয় সান্ত্বনা বা প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করতে পারেন। তখন বিড়ালের অপেক্ষাকৃত স্বাধীন বা নিষ্ক্রিয় আচরণ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে না-ও মিলতে পারে।
তবে এটি শুধু একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, প্রমাণিত কারণ নয়। গবেষণার লেখকেরাও বিষয়টি নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
কুকুর কি তাহলে বিড়ালের চেয়ে ভালো?
গবেষণাটি এমন কথা বলছে না।
বরং গবেষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—কোন প্রাণী ‘ভালো’, সেটি শুধু প্রজাতির ওপর নির্ভর করে বলা যায় না। মালিকের ব্যক্তিত্ব, পছন্দ, প্রাণীটির সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় সাধারণ মুহূর্তে কুকুর ও বিড়াল—দুই প্রাণীর সঙ্গেই মেলামেশা মানুষের ইতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তাই শুধু এই গবেষণার ফল দেখে কুকুরকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিড়ালের চেয়ে ভালো বলা যাবে না।

পোষা প্রাণী থাকলেই কি মানসিক স্বাস্থ্যের সব সমস্যা কমে যায়?
এমন ধারণাও ঠিক নয়।
মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর পোষা প্রাণীর প্রভাব নিয়ে আগের গবেষণাগুলোর ফল একেবারে একরকম নয়। ২০১২ সালের একটি বড় পর্যালোচনায় মানুষ ও প্রাণীর মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে মেজাজ, উদ্বেগ, কিছু স্ট্রেস-সম্পর্কিত শারীরবৃত্তীয় সূচকসহ বিভিন্ন ইতিবাচক ফলের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও গবেষকেরা সব ক্ষেত্রেই একই মাত্রার প্রমাণ পাননি।
অর্থাৎ পোষা প্রাণী মানুষের জীবনে আনন্দ, সঙ্গ ও আবেগগত সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু তাদের উপস্থিতিকে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
শুধু প্রাণী নয়, সম্পর্কটাও গুরুত্বপূর্ণ
পোষা প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অন্য যেকোনো সম্পর্কের মতোই ব্যক্তিভেদে আলাদা।
কারও কাছে বিড়ালের শান্ত উপস্থিতিই সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক। কেউ আবার কুকুরের সঙ্গে হাঁটতে বের হওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা কুকুরের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা বেশি উপভোগ করেন।
তাই ‘কুকুর না বিড়াল—কে বেশি মানসিক শান্তি দেয়?’—এর একক উত্তর সম্ভবত নেই। বরং কোন প্রাণীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন এবং কোন পরিস্থিতিতে আপনি তার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার—পোষা প্রাণীকে আদর করার অর্থ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধরে রাখা নয়। প্রাণীটি যদি দূরে সরে যেতে চায়, বিরক্ত হয় বা অস্বস্তির সংকেত দেয়, তাহলে তাকে নিজের মতো থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তাহলে খারাপ দিন কাটলে কী করবেন?
আপনার পোষা প্রাণী কাছে এলে তার সঙ্গে সময় কাটানো নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক হতে পারে। কিন্তু তাকে ‘স্ট্রেস কমানোর যন্ত্র’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
কখনো সে আপনার কাছে এসে বসবে, কখনো খেলতে চাইবে, আবার কখনো নিজের মতো থাকতে চাইবে। গবেষণার ফলও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পোষা প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশা সাধারণ সময়ে মন ভালো করার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, তীব্র মানসিক চাপের সমাধান হিসেবে এটিকে নিশ্চিত পদ্ধতি বলা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের মানসিক চাপের কারণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা দৈনন্দিন জীবনকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করে, তাহলে শুধু পোষা প্রাণীর ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবার, বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া উচিত।
পোষা প্রাণীকে ঘিরে প্রচলিত ধারণাটি পুরোপুরি ভুল নয়, আবার পুরোপুরি সত্যও নয়।
গবেষণা বলছে, কুকুর বা বিড়ালের সঙ্গে মেলামেশা সাধারণ মুহূর্তে মানুষের ইতিবাচক অনুভূতি বাড়াতে এবং নেতিবাচক অনুভূতি কমাতে পারে। কিন্তু তীব্র মানসিক চাপের সময় এই মেলামেশা চাপের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে দেবে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিড়ালের ক্ষেত্রে বরং কিছু পরিস্থিতিতে উল্টো সম্পর্ক দেখা গেলেও সেটিকে নিশ্চিত কারণ-ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো প্রমাণ এখনো নেই।
তাই পোষা প্রাণীকে ভালোবাসুন, তার সঙ্গে সময় কাটান—কিন্তু তার আচরণ ও নিজের পরিস্থিতি দুটোকেই গুরুত্ব দিন। শেষ পর্যন্ত মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে কোনো একক ‘জাদুর সমাধান’ নয়, বরং ভালো সম্পর্ক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার সমন্বয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



