ভালোবাসা নাকি বাড়তি দায়িত্ব? ‘ম্যানকিপিং’ নিয়ে কেন বাড়ছে আলোচনা

সম্পর্ক মানেই শুধু ভালোবাসা, রোমান্স কিংবা একসঙ্গে সময় কাটানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একে অপরের খেয়াল রাখা, আবেগ বোঝা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা এবং কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো নানা দায়িত্ব। কিন্তু এসব দায়িত্ব যদি বারবার একজনের কাঁধেই এসে পড়ে, তাহলে ভালোবাসার সম্পর্কও ধীরে ধীরে মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে অনেক নারী অভিযোগ করেন, সঙ্গীর আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় কাজ কিংবা সম্পর্কের নানা বিষয় সামলানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তাদেরই নিতে হয়। এই অদৃশ্য ও একতরফা যত্নের শ্রমকে সাম্প্রতিক ডেটিং আলোচনায় বলা হচ্ছে ‘ম্যানকিপিং’।

ম্যানকিপিং আসলে কী?
সহজ ভাষায়, একজন পুরুষের আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় ঠিকঠাক রাখার জন্য তার নারী সঙ্গী যখন নিয়মিত অতিরিক্ত মানসিক ও আবেগগত শ্রম দেন, সেটিই ম্যানকিপিং হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
এর মধ্যে থাকতে পারে সঙ্গীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া, তার মন খারাপ বুঝে সান্ত্বনা দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের জন্মদিন বা বিশেষ দিনের কথা মনে রাখা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে উৎসাহ দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতা হয়ে থাকা।
এই ধারণার সঙ্গে ‘কিনকিপিং’ বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক ধরে রাখার অদৃশ্য দায়িত্বের পুরোনো সমাজবৈজ্ঞানিক ধারণার মিল রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেটিং ও সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় ‘ম্যানকিপিং’ শব্দটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রেমিকার পাশাপাশি যেন ‘ম্যানেজার’ও

একটি সম্পর্কে আবেগগত যত্নের বিষয়টি খুব স্বাভাবিক। সঙ্গী সমস্যায় পড়লে পাশে দাঁড়ানো, মন খারাপ হলে কথা শোনা কিংবা কঠিন সময়ে সাহস দেওয়া—এসবই সুস্থ সম্পর্কের অংশ।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই দায়িত্ব একতরফা হয়ে যায়।
ধরা যাক, পুরুষ সঙ্গী নিয়মিত তার অফিসের চাপ, অর্থনৈতিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত হতাশার কথা বলছেন। নারী সঙ্গী মন দিয়ে শুনছেন, সমাধানের পথ খুঁজছেন এবং তাকে মানসিকভাবে সামলে রাখছেন। কিন্তু নারী নিজে সমস্যায় পড়লে একই ধরনের মনোযোগ বা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। তখন সম্পর্কের আবেগগত ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে।
অদৃশ্য শ্রমেরও একটা মূল্য আছে

ঘরের কাজের মতো মানসিক ও আবেগগত শ্রমের কোনো সহজ হিসাব থাকে না। কে বাজার করবে, কে রান্না করবে—এসব দৃশ্যমান। কিন্তু কে মনে রাখছে সঙ্গীর গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের কথা, কে পরিকল্পনা করছে জন্মদিন, কে ঝগড়ার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিচ্ছে—এসব কাজ চোখে পড়ে না।
এ কারণেই অনেক সময় এই শ্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মেন্টাল লোড’। অর্থাৎ শুধু কোনো কাজ করা নয়, কাজটি করার কথা মনে রাখা, পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজন হলে অন্য ব্যক্তিকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও একজনের ওপর থাকা।
একজন নারী যদি একই সঙ্গে নিজের কাজ, নিজের আবেগ, সংসার এবং সঙ্গীর আবেগগত প্রয়োজন সামলাতে থাকেন, তাহলে দীর্ঘদিন পর স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন সম্পর্কে যাওয়ার সময় অনেকেই ভালোবাসা, আকর্ষণ ও মানসিক মিলের কথা ভাবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যদি বোঝা যায়, সঙ্গীর জীবনের আবেগগত ব্যবস্থাপনার বড় অংশ নিজের ওপর এসে পড়ছে, তখন সেই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা বদলে যেতে পারে।
কারও কাছে তখন প্রেমের সম্পর্ক মানে শুধু একজন সঙ্গী পাওয়া নয়; বরং তাঁর আবেগ সামলানো, সামাজিক যোগাযোগের কথা মনে করিয়ে দেওয়া এবং সম্পর্কের নানা আয়োজনের দায়িত্ব নেওয়াও হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে সম্পর্কের শুরুতেই দায়িত্বের ভারসাম্য নিয়ে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দুজনেরই যদি একে অপরকে বোঝার, খোঁজ নেওয়ার এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকে, তাহলে এই ধরনের চাপ অনেকটাই কমে যায়।
শব্দটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক

‘ম্যানকিপিং’ শব্দটি নিয়ে অবশ্য সবার মত এক নয়। সমর্থকদের মতে, সম্পর্কের মধ্যে নারীরা যে অদৃশ্য আবেগগত শ্রম দিয়ে থাকেন, সেটিকে চিহ্নিত করার জন্য এমন একটি শব্দ প্রয়োজন। কারণ কোনো সমস্যার নাম জানা গেলে সেটি নিয়ে আলোচনা করাও সহজ হয়।
অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, শব্দটি ব্যবহার করতে গিয়ে সব পুরুষকে একই ধরনের আচরণের জন্য দায়ী করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বাস্তবে প্রতিটি সম্পর্কের পরিস্থিতি আলাদা। অনেক পুরুষও সঙ্গীর আবেগ, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমান দায়িত্ব পালন করেন।
তাই ম্যানকিপিংকে পুরুষবিরোধী কোনো ধারণা হিসেবে না দেখে সম্পর্কের দায়িত্ব কতটা ভারসাম্যপূর্ণ, তা বোঝার একটি ধারণা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দরকার পারস্পরিক যত্ন
একটি সম্পর্কের স্বাস্থ্যকর চিত্র খুব জটিল নয়। দুজনেই কি একে অপরের কথা মন দিয়ে শুনছেন? দুজনেই কি প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকছেন? গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মনে রাখার দায়িত্ব কি একজনের ওপরই পড়ছে? নাকি দুজনেই সমানভাবে সম্পর্কটিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তরই অনেক কিছু পরিষ্কার করে দিতে পারে।
ভালোবাসা শুধু ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যত্ন নেওয়া, সময় দেওয়া, মনোযোগ দেওয়া এবং সম্পর্কের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াও ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই দায়িত্ব যখন দীর্ঘদিন ধরে এক ব্যক্তির ওপর জমতে থাকে, তখন ভালোবাসার জায়গাতেও ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
আর সেই অদৃশ্য ক্লান্তি ও অসম দায়িত্বের দিকেই নতুন করে আলো ফেলছে ‘ম্যানকিপিং’ শব্দটি।



