বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিশ্লেষণ

মেজাজ ও ঘুমে শব্দদূষণের প্রভাব কতটা জানেন?

Noise Pollution Hero Banner (Website)

শব্দ আমাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। পছন্দের গান, পাখির ডাক কিংবা প্রিয়জনের কণ্ঠ—এসব শব্দ যেমন মন ভালো করে, তেমনি অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত শব্দ হয়ে উঠতে পারে বিরক্তি ও অস্বস্তির কারণ। বিশেষ করে দীর্ঘসময় উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে এর প্রভাব শুধু শ্রবণশক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; নষ্ট হতে পারে ঘুম, বদলে যেতে পারে মেজাজ, বাড়তে পারে মানসিক চাপ, এমনকি তৈরি হতে পারে সম্পর্কের টানাপোড়েনও।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। যানজটের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হর্ন, আবাসিক এলাকায় নির্মাণকাজ, ড্রিলিং, পাইলিং, ভারী যন্ত্রপাতি ও টাইলস কাটার শব্দ নিয়মিত ভোগান্তির সৃষ্টি করছে। এর পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা, বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকায় উচ্চ শব্দে জেনারেটর এবং সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত মাইক-লাউডস্পিকারের ব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মেজাজ যখন শব্দে বদলে যায়

দীর্ঘসময় উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্কে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এতে শরীরে স্ট্রেস-সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। ফলে মানুষ সহজেই বিরক্ত, রাগী ও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

একটানা শব্দের কারণে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়, কমে যেতে পারে কর্মক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ছোটখাটো বিষয়েও রেগে যাওয়া, অস্থিরতা কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণ—সবকিছুর পেছনে দীর্ঘস্থায়ী শব্দদূষণ একটি ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘুমের ওপর বড় আঘাত

Advertisements

স্বাভাবিক ঘুমের জন্য শান্ত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গভীর রাতে উচ্চস্বরে গান, বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মাইক, ধর্মীয় আয়োজনের শব্দ কিংবা রাতভর নির্মাণকাজ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

শব্দের কারণে ঘুম আসতে দেরি হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা গভীর ঘুম কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়ে পরের দিনের জীবনেও। সকালে ক্লান্তি, দিনের বেলা ঝিমুনি, অবসাদ ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিন ঘুমের এই ঘাটতি চলতে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। পাশাপাশি উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের প্রয়োজন বেশি। শব্দদূষণের কারণে ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত তাদের শারীরিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শব্দের চাপে দূরে সরে যায় সম্পর্ক

শব্দদূষণের একটি অদৃশ্য প্রভাব পড়ে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে। ক্রমাগত বিরক্তি ও মানসিক চাপ মানুষের সহনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে যে বিষয়টি স্বাভাবিক সময়ে সহজেই সামলে নেওয়া সম্ভব, অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকা অবস্থায় সেটিই হয়ে উঠতে পারে বিরোধের কারণ।

অফিসে সহকর্মীর সঙ্গে অকারণে তর্ক, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কে বিরক্তি ও দূরত্ব—এসবের পেছনে পরোক্ষভাবে শব্দদূষণের প্রভাব থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শব্দে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলে তাদের মনোযোগ কমতে পারে, বিরক্তি বাড়তে পারে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা অতিরিক্ত শব্দের কারণে তুলনামূলক বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।

সমাধান শুরু হোক সচেতনতা থেকে

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়েই দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা, আবাসিক এলাকায় নির্মাণকাজের সময় ও শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে আশপাশের মানুষের স্বস্তির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে রাতের বেলায় মাইক ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার সীমিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বাড়িতে শব্দরোধী জানালা, দরজা বা পর্দা ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। নিয়মিত শব্দমাত্রা পরিমাপ, অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও অতিরিক্ত শব্দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

শব্দদূষণকে শুধু বিরক্তির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ একটি শহরের শব্দ তার মানুষের জীবনযাপন, ঘুম, মানসিক স্বস্তি ও সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই অন্যের আনন্দ যেন অন্যের অশান্তির কারণ না হয়—এই বোধ থেকেই শুরু হতে পারে শব্দদূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।

Advertisements