শরীর সুস্থ ও ফিট, তবু কেন হতে পারে হার্ট অ্যাটাক?

শরীরের ওজন স্বাভাবিক, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, ধূমপান করেন না এবং খাবারদাবারেও যথেষ্ট সচেতন—তারপরও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কারণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। নীরবে শরীরে বেড়ে চলা উচ্চ কোলেস্টেরলও হৃদ্যন্ত্রের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজেকে ফিট মনে করলেই হৃদ্যন্ত্র সম্পূর্ণ সুস্থ—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেকের রক্তে দীর্ঘদিন ধরে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলেও কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ধীরে ধীরে এই কোলেস্টেরল ধমনির দেয়ালে জমে প্লাক তৈরি করতে পারে। একপর্যায়ে ধমনি সরু হয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।
ফিট থাকলেও ঝুঁকি থাকতে পারে
নিয়মিত ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে শরীরচর্চা করলেই কোলেস্টেরল বা অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। বিশেষ করে বংশগত কারণে কারও এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেও ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।চিকিৎসকদের কাছে এমন রোগীও আসছেন, যারা নিয়মিত দৌড়ান বা জিম করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং ধূমপান করেন না। কিন্তু পরীক্ষায় তাদের ধমনিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্লক ধরা পড়ছে।
যেমন, ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিয়মিত হাফ-ম্যারাথনে অংশ নিতেন। তাঁর জীবনযাপনও ছিল স্বাস্থ্যকর। কিন্তু দৌড়ানোর সময় বুকে হালকা চাপ অনুভূত হওয়ায় পরীক্ষা করান তিনি। পরীক্ষায় তাঁর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা পাওয়া যায় ১৯০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। পরবর্তী পরীক্ষায় হৃদ্যন্ত্রের একটি ধমনিতে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্লক ধরা পড়ে। পরে তাঁর এনজিওপ্লাস্টি করতে হয়।
কোলেস্টেরল কীভাবে ক্ষতি করে?
কোলেস্টেরলকে শুধু অতিরিক্ত ওজন বা শরীরে জমে থাকা চর্বির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের একটি বড় অংশ লিভারেই তৈরি হয়। আবার বংশগত কারণেও কারও রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন রক্তে এলডিএল বেশি থাকলে তা ধমনির দেয়ালে জমে প্লাক তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই প্লাক বাড়তে থাকলে ধমনির ভেতরের পথ সরু হয়ে যায় এবং হৃদ্যন্ত্রে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়া অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই চলতে থাকে। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ধমনিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকই প্রথম বড় সতর্কবার্তা হয়ে আসে।
কীভাবে আগেই ঝুঁকি বোঝা যাবে?

শুধু শরীরের ওজন, গঠন বা বাহ্যিক ফিটনেস দেখে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অল্প বয়সে হৃদ্রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক লিপোপ্রোটিন (এ), অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি বা অন্যান্য পরীক্ষা করাতে পারেন। কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমার মাত্রা নির্ণয়ে করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম (সিএসি) স্কোরিংয়েরও প্রয়োজন হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বন্ধ নয়
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব অভ্যাস থাকলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
অর্থাৎ, শরীর সুস্থ ও ফিট দেখালেই হৃদ্যন্ত্রের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী কোলেস্টেরলসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোও হৃদ্রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



