৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

ডিপ্রেশন থেকে সিজোফ্রেনিয়া: যে ১০ মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যায়

2238b000-84a7-11ef-8fff-0b75cefc5a9d.jpg

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা ও সামাজিক সংকোচ রয়েছে। অনেকেই মানসিক সমস্যাকে অসুস্থতা হিসেবে না দেখে ব্যক্তির দুর্বলতা, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা ‘পাগলামি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও অনেক সময় বিষয়টি স্বীকার করতে চান না বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের হার তুলনামূলকভাবে কম। সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছেন। তবে অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার পরিবর্তে শারীরিক উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেশি।

বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে যে মানসিক সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন

ডিপ্রেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণ মন খারাপ আর বিষণ্ণতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো কারণে সাময়িকভাবে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকা, আগের পছন্দের কাজগুলোতে আগ্রহ বা আনন্দ হারিয়ে ফেলা বিষণ্ণতার লক্ষণ হতে পারে।

টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিষণ্ণতার সঙ্গে শারীরিক দুর্বলতা, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা, হজমের সমস্যা, হাত-পা জ্বালাপোড়া এবং অস্থিরতার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মহানির চিন্তাও তৈরি হতে পারে।

২. প্যানিক ডিজঅর্ডার

প্যানিক ডিজঅর্ডারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হঠাৎ তীব্র আতঙ্ক বা প্যানিক অ্যাটাক। অল্প সময়ের মধ্যেই এর উপসর্গ অনেক বেড়ে যেতে পারে। তখন আক্রান্ত ব্যক্তির মনে হতে পারে তিনি গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন।

Advertisements

হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি এবং তীব্র ভয় এর সাধারণ লক্ষণ। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে মানুষ জরুরি বিভাগে গেলেও পরীক্ষায় বড় কোনো শারীরিক সমস্যা পাওয়া যায় না। ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া ও দুঃস্বপ্নও এর সঙ্গে থাকতে পারে।

৩. জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার

সবসময় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ছোটখাটো বিষয়েও আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্বস্তি—এসব জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় উদ্বেগ যেন আক্রান্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়।

অস্থিরতা, খিটখিটে মেজাজ, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা এবং স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো অনুভূতিও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, পেটের অস্বস্তি, হজমের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো শারীরিক উপসর্গও দেখা যায়।

৪. শুচিবায়ু বা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার

কোনো কাজ বারবার করা বা একই চিন্তা বারবার মাথায় আসা—সবসময়ই যে রোগের লক্ষণ, তা নয়। তবে কোনো ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয়ভাবে একই কাজ বারবার করতে বাধ্য বোধ করলে এবং কাজটি শেষ হওয়ার পরও মনে হতে থাকলে যে ঠিকমতো হয়নি, তখন সেটি ওসিডির লক্ষণ হতে পারে।

এ ধরনের ব্যক্তিরা অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই কাজ করতে পারেন। অনর্থক বা অযৌক্তিক চিন্তা মাথায় আসছে—এটা বুঝতে পারলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা, কাজের গতি ধীর হওয়া এবং সবসময় উদ্বিগ্ন থাকার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।

৫. পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

ব্যক্তিত্বের কিছু দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর আচরণগত বৈশিষ্ট্য যখন ব্যক্তির নিজের জীবন ও আশপাশের মানুষের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে, তখন তা পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যায় নিজের প্রতি ক্ষতিকর আচরণ, আত্মহানির চেষ্টা কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এর পাশাপাশি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের সমস্যাও থাকতে পারে।

৬. ফোবিক ডিজঅর্ডার

অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ভয় যখন ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা তৈরি করে, তখন সেটি ফোবিক ডিজঅর্ডারের পর্যায়ে যেতে পারে। কেউ একা দূরে যেতে ভয় পান, কেউ গণপরিবহনে উঠতে অস্বস্তি বোধ করেন, আবার কেউ উঁচু জায়গা, বিমান বা বদ্ধ স্থানে যাওয়াকে এড়িয়ে চলেন।

এ ধরনের মানুষ সাধারণত এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন, যেখানে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণহীন বা অনিরাপদ মনে করেন। ফলে ভয়টি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজ ও সামাজিক জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

৭. এডিএইচডি

অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার বা এডিএইচডি শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত চঞ্চলতা, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা এবং আচরণগত সমস্যার মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটতে পারে।

শিশু-কিশোরদের আরও বিভিন্ন মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে স্কুলভীতি, স্কুল এড়িয়ে চলা, আচরণগত সমস্যা, অটিজম, বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা, ঘুম ও খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যাও রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের পাশাপাশি জন্মের সময় মাথায় আঘাতের মতো বিষয়ও কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। অতিরিক্ত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণগত সমস্যাও বর্তমানে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

৮. ডিমেনশিয়া বা নিউরোকগনিটিভ ডিজঅর্ডার

বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তির অবনতি, চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের মধ্যে ডিমেনশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে।

বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। স্মৃতিভ্রমের পাশাপাশি বিষণ্ণতা এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার প্রভাবেও বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

৯. একিউট স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ও পিটিএসডি

ভয়াবহ দুর্ঘটনা, সহিংসতা, নির্যাতন বা অন্য কোনো গুরুতর ঘটনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এমন অভিজ্ঞতার পর তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডিতে রূপ নিতে পারে।

ঘটনার স্মৃতি বারবার মনে পড়া, ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা এবং সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মানসিক প্রভাব দীর্ঘদিন বহন করা এ ধরনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

১০. বাইপোলার ডিজঅর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়া

বাইপোলার ডিজঅর্ডার গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। এতে ব্যক্তির মেজাজে তীব্র ওঠানামা দেখা যায়। কখনো অতিরিক্ত উৎফুল্ল বা সক্রিয় থাকার সময় আসে, আবার অন্য সময়ে গভীর বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাগুলো কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা গেলেই নিজে থেকে বাইপোলার ডিজঅর্ডারের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়; সঠিক মূল্যায়নের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

সিজোফ্রেনিয়াও একটি গুরুতর মানসিক রোগ। এতে চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ভুল ধারণা, অস্বাভাবিক সন্দেহ, বিভ্রান্তি ও বাস্তবে নেই এমন কিছু দেখা বা শোনার অভিজ্ঞতা এর অন্যতম লক্ষণ। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ প্রকাশ পেতে পারে। মনোযোগ কমে যাওয়া, আবেগের প্রকাশ কমে যাওয়া এবং নিজের যত্নের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়াও দেখা যেতে পারে।

মানসিক সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লক্ষণ দেখা দিলেই নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করা। দীর্ঘদিন ধরে আচরণ, মেজাজ, চিন্তা বা দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন লক্ষ্য করলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক অসুস্থতাকে লুকিয়ে না রেখে সময়মতো সহায়তা নেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisements