বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

যে শহরে থাকতে হলে আগে কে’টে ফেলতে হয় শরীরের একটি অঙ্গ!

8822243

পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি অ্যান্টার্কটিকা। বরফে ঢাকা এই মহাদেশে জনবসতি বলতে মূলত বিভিন্ন দেশের গবেষণা ও সামরিক ঘাঁটিকেই বোঝায়। তবে এখানেই রয়েছে এমন একটি ছোট বসতি, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চাইলে একটি অদ্ভুত চিকিৎসা-শর্ত মানতে হয়—শরীর থেকে অপসারণ করতে হয় অ্যাপেন্ডিক্স।


চিলির ভিয়া লাস এস্ত্রেলাস (Villa Las Estrellas) অবস্থিত অ্যান্টার্কটিকার কিং জর্জ আইল্যান্ডে। এটি কেবল গবেষণা স্টেশন নয়; এখানে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ ও পরিবারও বসবাস করে। বসতিতে চিকিৎসাসহ দৈনন্দিন জীবনের কিছু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু দুর্গম অবস্থানের কারণে গুরুতর জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখানকার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দাদের জন্য অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। চিলির অ্যান্টার্কটিক কার্যক্রমে এই প্রতিরোধমূলক অ্যাপেনডেকটমির কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৬৯ সালে। পরে ১৯৮৩ সালে ভিয়া লাস এস্ত্রেলাস প্রতিষ্ঠার পর সেখানে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও তা সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৯১ সাল থেকে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতেও এই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। চিলির একটি মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে এই কর্মসূচিতে প্রায় ১,৫০০ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, অ্যাপেন্ডিক্স নিয়ে এত সতর্কতার কারণ কী?

অ্যাপেন্ডিসাইটিস হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে অ্যাপেন্ডিক্সে ছিদ্র হয়ে পেটের ভেতরে গুরুতর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণ কোনো শহরে এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতাল ও সার্জনের কাছে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার এই প্রত্যন্ত এলাকায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভিয়া লাস এস্ত্রেলাসে চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও সেখানে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা সীমিত এবং সবসময় বিশেষজ্ঞ সার্জন উপস্থিত থাকেন না। সবচেয়ে কাছের বড় হাসপাতালও শত শত কিলোমিটার দূরে। খারাপ আবহাওয়া, বরফ ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি অবস্থায় দ্রুত রোগী সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে।

এই বাস্তবতাই অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণকে একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তিযুক্ত করেছে। অর্থাৎ অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার পর অস্ত্রোপচার নয়; বরং দুর্গম এলাকায় যাওয়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকিটি দূর করে দেওয়া।

তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকায় যেতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণ করতে হয়—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। এই শর্ত মূলত ভিয়া লাস এস্ত্রেলাসের মতো নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত; স্বল্পমেয়াদি দর্শনার্থীদের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়।

ভিয়া লাস এস্ত্রেলাস তাই শুধু বরফের মধ্যে একটি বসতি নয়, বরং চরম পরিবেশে মানুষের বেঁচে থাকার প্রস্তুতির এক অনন্য উদাহরণ। যেখানে একটি স্বাভাবিক চিকিৎসা-জরুরি অবস্থা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোকাবিলা করা সম্ভব, সেখানে অ্যান্টার্কটিকায় একই সমস্যাই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আর সেই কারণেই সেখানে বসবাসের আগে শরীরের একটি ছোট অঙ্গের সম্ভাব্য ঝুঁকিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়।

Advertisements