প্রাক্তনকে ভুলতে ৮ বছর! বিচ্ছেদের পরও কেন মুছে যায় না প্রাক্তনের স্মৃতি

একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার গল্পটা কি সেদিনই শেষ হয়? অনেক সময় উত্তরটা হয়—না। মানুষটি জীবনে না থাকলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, অভ্যাস, কথোপকথন কিংবা একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন থেকে যায় মনের ভেতর। কখনো হঠাৎ কোনো গান, পরিচিত রাস্তা, পুরোনো ছবি কিংবা প্রিয় কোনো খাবার সেই মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মনে হয়, এতদিন পরও কেন তাকে ভুলতে পারছি না?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি দাবি—প্রাক্তন সঙ্গীকে পুরোপুরি ভুলে যেতে মানুষের নাকি প্রায় আট বছর সময় লাগে। বিষয়টি শুনতে অবাক করার মতো হলেও বাস্তবতা এতটা সরল নয়। কারণ কোনো সম্পর্ক থেকে মানসিকভাবে বেরিয়ে আসতে নির্দিষ্ট একটি সময় সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারও কয়েক সপ্তাহ লাগে, কারও কয়েক মাস, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে।
তবে দীর্ঘ সম্পর্কের বিচ্ছেদ যে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একটি সম্পর্কের সঙ্গে শুধু একজন মানুষই জড়িয়ে থাকে না; জড়িয়ে থাকে দৈনন্দিন অভ্যাস, সামাজিক পরিচয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আবেগের নানা স্তর। তাই বিচ্ছেদের পর মানুষকে শুধু একজন প্রিয়জনকেই হারাতে হয় না, অনেক সময় হারাতে হয় নিজের পরিচিত জীবনযাত্রার একটি অংশও।
এই কারণেই বিচ্ছেদের পর প্রথম দিকে মন বারবার অতীতের দিকে ফিরে যেতে পারে। ‘কোথায় ভুল হলো’, ‘আরেকটু চেষ্টা করলে কি সম্পর্কটা টিকে যেত’, ‘সে কি এখনও আমাকে মনে করে’—এ ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, পুরোনো ছবি খোঁজা কিংবা পুরোনো বার্তা পড়ার অভ্যাসও তৈরি হয়। এতে সম্পর্কটি শেষ হয়ে গেলেও মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে।
আবার সময়ের সঙ্গে স্মৃতির ধরনও বদলে যায়। শুরুতে বিচ্ছেদের স্মৃতি তীব্র কষ্টের কারণ হলেও পরে সেটিই জীবনের একটি অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। মানুষ তখন প্রাক্তনকে ভুলে যায়—এমনটা সবসময় নয়; বরং স্মৃতিটির সঙ্গে যুক্ত আবেগের তীব্রতা কমে আসে। একসময় যে ছবি দেখলে বুক ভার হয়ে যেত, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো শুধুই অতীতের একটি ছবি মনে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ভুলে যাওয়া’ আর ‘এগিয়ে যাওয়া’ এক বিষয় নয়। কাউকে পুরোপুরি স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নাও হতে পারে। বরং সুস্থভাবে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, সেই মানুষটির স্মৃতি থাকলেও তা যেন বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
বিচ্ছেদের পর নিজের ওপর অযথা সময়ের চাপ দেওয়াও ঠিক নয়। অন্য কেউ তিন মাসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে বলে আপনাকেও তিন মাসেই ফিরতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করা, কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নতুন অভ্যাস তৈরি করা এবং নিজের জীবনকে আবার নিজের মতো করে সাজানো গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো সম্পর্ক ভাঙার পর মানুষ নিজের মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমাকে ছেড়ে গেছে মানেই হয়তো আমি যথেষ্ট ভালো ছিলাম না।’ কিন্তু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি কোনো মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে না। বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা হলো এবং এরপর নিজের জীবনকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হলো, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রাক্তনকে ভুলতে ঠিক আট বছর লাগবেই—এমন ধারণাকে কঠিন সত্য হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারও ক্ষেত্রে সময়টা অনেক কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। আসল বিষয় হলো ক্যালেন্ডারের পাতা কতবার বদলেছে তা নয়; বরং একসময় যে মানুষটি আপনার প্রতিদিনের জীবনের কেন্দ্র ছিল, তার অনুপস্থিতির পর আপনি আবার নিজের জীবনকে কতটা আপন করে নিতে পেরেছেন।
কারণ শেষ পর্যন্ত কাউকে ভুলে যাওয়া নয়, নিজের কাছে ফিরে আসাটাই হয়তো বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় সুস্থ হয়ে ওঠা।



