৫ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২০ আশ্বিন ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

সৌন্দর্য নয়, লাল লিপস্টিক ছিল কখনো প্রতিবাদের ভাষাও

IMG-20261004-WA0043

এক টুকরো লাল রং। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিলেই বদলে যায় মুখের অভিব্যক্তি। কখনো হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, কখনো ব্যক্তিত্বের পরিচয়, আবার কখনো নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু জানেন কি, ঠোঁটের এই লাল রঙের গল্প আজকের নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস।

সময়ের সঙ্গে পোশাক বদলেছে, সাজসজ্জার ধরন বদলেছে, এসেছে অসংখ্য নতুন প্রসাধনী। কিন্তু লাল লিপস্টিক যেন বারবার ফিরে এসেছে নতুন অর্থ নিয়ে। কখনো রাজকীয়তার প্রতীক, কখনো সামাজিক নিষেধের কারণ, আবার কখনো নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি।

রাজদরবার থেকে শুরু

লাল ঠোঁটের ইতিহাসের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩৫০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ার রাজপরিবারের নারী পুয়াবির সমাধি থেকে এমন প্রসাধন সামগ্রীর সন্ধান পাওয়া যায়, যা ঠোঁট রাঙাতে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। লাল পাথর ও অন্যান্য উপাদান গুঁড়া করে তৈরি করা সেই রঞ্জক ছিল তখনকার অভিজাতদের সাজের অংশ। প্রাচীন মিসরেও ঠোঁট রাঙানোর চল ছিল। রানি ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যচর্চা নিয়ে নানা ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়। লাল রঞ্জক, মোম ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে ঠোঁটে রং দেওয়ার প্রচলন ছিল সে সময়। অর্থাৎ, লাল ঠোঁট তখন কেবল সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সামাজিক অবস্থান, আভিজাত্য এবং বিশ্বাসও।
তবে সব সভ্যতায় লাল ঠোঁট সমান মর্যাদা পায়নি।

কখনো সৌন্দর্য, কখনো অপরাধ!

প্রাচীন গ্রিসে লাল ঠোঁটের সঙ্গে যৌনকর্মীদের পরিচয় জড়িয়ে পড়েছিল। সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী নারীর সাজসজ্জার ওপরও ছিল নানা বিধিনিষেধ। ফলে লাল রঙের ঠোঁট অনেক সময় সৌন্দর্যের চেয়ে সামাজিক পরিচয়ের সংকেত হয়ে উঠত। রোমান সাম্রাজ্যে অবশ্য পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। সেখানে লাল ঠোঁট অভিজাত নারীদের সাজের অংশ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু তখন ব্যবহৃত কিছু প্রসাধনীতে ক্ষতিকর উপাদান থাকায় সৌন্দর্যের এই চর্চার সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও জড়িয়ে ছিল।

Advertisements

এরপর ইউরোপের মধ্যযুগে এসে মেকআপের জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমে যায়। ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রসাধনী ব্যবহারকে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বা অনৈতিক হিসেবে দেখা হতো।

রানি এলিজাবেথের লাল ঠোঁট

ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ লাল ঠোঁটকে আবার রাজকীয় সৌন্দর্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ফ্যাকাশে মুখের সঙ্গে গাঢ় লাল ঠোঁট হয়ে ওঠে তাঁর পরিচিত সাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে রানির মৃত্যুর পর আবারও প্রসাধনী নিয়ে সামাজিক সন্দেহ বাড়তে থাকে। ইউরোপের বিভিন্ন সময়ে নারীর সৌন্দর্যচর্চাকে এমনকি জাদুবিদ্যা বা প্রতারণার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনে নারীরা প্রসাধনীর মাধ্যমে পুরুষকে প্রলুব্ধ করে বিয়ে করলে তাকে প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করার মতো আইনগত ধারণাও প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ, একটি লিপস্টিকের রং কখনো কখনো নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারত।

লাল রং যখন প্রতিবাদের ভাষা

বিশ শতকে এসে লাল লিপস্টিকের গল্পে আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় লাল ঠোঁট ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার দৃশ্যমান প্রতীক। ১৯১২ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে নারী অধিকারকর্মীদের মধ্যে লাল লিপস্টিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রসাধনী উদ্যোক্তা এলিজাবেথ আর্ডেনও নারী আন্দোলনকারীদের লাল লিপস্টিক সরবরাহ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাল লিপস্টিক নতুন অর্থ পায়। যুদ্ধের কঠিন সময়ে নারীদের মনোবল ধরে রাখতে লাল লিপস্টিককে সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেশপ্রেম ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরা হয়। ‘ভিক্টরি রেড’ বা ‘ফাইটিং রেড’-এর মতো নামের লাল শেড তখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি নাৎসি জার্মানির নেতা অ্যাডলফ হিটলারের লাল লিপস্টিক অপছন্দের বিষয়টি মিত্রশক্তির দেশগুলোর নারীদের মধ্যে এই রঙের প্রতীকী গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

পর্দায় গ্ল্যামার, রাজপথে প্রতিবাদ

যুদ্ধের পর লাল লিপস্টিকের সঙ্গে যুক্ত হয় হলিউডের জৌলুস। মেরিলিন মনরো, অড্রে হেপবার্নসহ বহু তারকা লাল ঠোঁটকে নিজেদের সৌন্দর্যের স্বাক্ষর হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরবর্তী সময়ে টেলর সুইফট, রিহানাসহ সমকালীন তারকারাও লাল লিপস্টিককে নিজেদের সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন।
কিন্তু লাল ঠোঁট শুধু পর্দায় আটকে থাকেনি। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনেও এটি ফিরে এসেছে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে। ২০১৮ সালে নিকারাগুয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৯ সালে চিলিতে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নারীদের লাল লিপস্টিক ব্যবহারের ঘটনাও আলোচনায় আসে।

রঙ বদলায়নি, বদলেছে তার অর্থ

মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন প্রসাধন সামগ্রী থেকে আজকের মসৃণ, দীর্ঘস্থায়ী লিপস্টিক—প্রযুক্তি বদলেছে, উপাদান বদলেছে, বদলেছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও। কিন্তু লাল রঙের আবেদন যেন কোথাও হারিয়ে যায়নি।

আজ একজন নারী যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক পরেন, সেটি হয়তো তাঁর কাছে শুধুই সাজ। আবার কারও কাছে সেটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কারও কাছে ব্যক্তিত্বের পরিচয়, কারও কাছে নিছক প্রিয় একটি রং।
তবু ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, লাল লিপস্টিকের গল্প শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়। এই রঙের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজকীয়তা, সামাজিক নিষেধ, নারীর স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় এবং প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস।

সাড়ে পাঁচ হাজার বছর ধরে তাই লাল ঠোঁট বারবার নিজের অর্থ বদলেছে—কিন্তু হারায়নি তার উপস্থিতি। হয়তো এ কারণেই আজও আয়নার সামনে একটুখানি গাঢ় লাল রং টেনে নেওয়া কখনো কখনো শুধু সাজ নয়, নিজের অস্তিত্বকে নিজের মতো করে প্রকাশ করারও এক দৃশ্যমান ভাষা।

Advertisements