বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস আজ: ছবির ফ্রেমে অমর হয়ে থাকুক সময়, স্মৃতি ও ভালোবাসা

আকাশ গাঢ় নীলে ভাসছে সাদা মেঘ। আবার বিলের জলে ফুটে রয়েছে অজস্র সাদা শাপলা। দূরে, ওই পারে, বাতাসে দোল খায় সাদা কাশফুল। শরৎকালে গ্রামবাংলায় এ দৃশ্য নিত্যদিনের। এই অপরূপ শোভা দেখতে দল বেঁধে আসে তরুণ-তরুণীরা। কিন্তু তারা মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে ব্যস্ত। তাদের চাই ‘পারফেক্ট শট’। এ জন্য বারবার পোজ পাল্টায়। এংগেল মেলায়। এরপর স্ক্রিনে আঙুলের ছোঁয়া। তাতেই ফ্রেমবন্দি হয় নানা মুহূর্ত, নানা ভঙ্গিতে। এসব ছবি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু প্রকৃতির খুব কাছে এসেও, এর রূপ উপভোগ করার মতো অবসর নেই এই তরুণ-তরুণীদের। এরা প্রকৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করতে নয়, বরং ডিজিটাল দুনিয়ায় দেখাতে ব্যস্ত।
আজ ১৯ আগস্ট, বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস। কিন্তু ২০২৬ সালের এই মেগা-ডিজিটাল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আলোকচিত্রের প্রশ্নটি আর কেবল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন কিংবা তার গৌরবময় ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ছবি তোলার ধরন ও সংখ্যায় গত কয়েক দশকে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দৈনিক গড়ে ৩৫০ কোটিরও বেশি ছবি ডিজিটাল মাধ্যমে আপলোড ও আদান-প্রদান করা হচ্ছে। অ্যানালগ যুগে একটি ফিল্ম রোলে ২৪ বা ৩৬টির বেশি শট নেওয়ার সুযোগ ছিল না। পারিবারিক অ্যালবামের পাতা ওল্টালে পাওয়া যেত একটি প্রজন্মের গল্প, সম্পর্ক ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের ‘ছবিবন্দি’ রূপ। এর বিপরীতে, আজকের এই স্মার্টফোনের যুগে অগণিত ছবি তোলা হয়।
প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা আলোকচিত্রকে সবার হাতের মুঠোয় এনেছে ঠিকই, কিন্তু সৃষ্টি করেছে নতুন এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। ছবি এখন অনেক সময় স্মৃতি সংরক্ষণের চেয়ে সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ ও প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশা আমাদের দেখার অভ্যাসকেও প্রভাবিত করছে।
ঢাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সমীক্ষা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো বস্তু ও ঘটনাকে খালি চোখে দেখার চেয়ে ক্রমাগত ক্যামেরাবন্দি করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলে মানুষের মস্তিষ্ক সেই ঘটনার মূল স্মৃতির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ, মুহূর্তকে যাপন করার চেয়ে তা বিশ্বকে দেখাতে গিয়ে মানুষ সেই মুহূর্তটির মূল অনুভূতি ও স্মৃতি নিজের মগজে ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
উল্টো স্রোতও দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি ও টিএসসি এলাকায় তরুণদের একাংশ আবার ফিল্ম ক্যামেরার দিকে ঝুঁকছে। তারা নিখুঁত ছবি নয়, খুঁজছে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা এবং ‘অসম্পূর্ণতার নান্দনিকতা’। তরুণ আলোকচিত্রী ও শিক্ষার্থী সায়মা তাসনিমের ভাষায়, এআই দিয়ে নিখুঁত ছবি তৈরি করা সহজ; কিন্তু ফিল্মের সীমিত ফ্রেমে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করার যে আনন্দ, তার বিকল্প নেই।
মার্কিন আলোকচিত্রী ডোরোথিয়া ল্যাঞ্জ বলেছিলেন, ‘ক্যামেরা এমন এক যন্ত্র, যা মানুষকে শেখায় কীভাবে ক্যামেরা ছাড়াই বিশ্বকে দেখতে হয়।’ আলোকচিত্রীর ক্যামেরা আসলে তাঁর দৃষ্টিরই সম্প্রসারণ। একটি ছবির মূল্য কেবল মেগাপিক্সেল বা প্রযুক্তিতে নয়; তার মূল্য নির্ভর করে লেন্সের পেছনে থাকা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, সংবেদনশীলতা ও পর্যবেক্ষণের গভীরতার ওপর।
তাই বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে আমাদের হয়তো একটু থামা উচিত। প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি করার আগে একবার খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা দরকার। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কোনো মেমোরি কার্ডে নয়; সংরক্ষিত থাকে মানুষের হৃদয়ের গভীরে, স্মৃতিতে। আর একটি প্রকৃত আলোকচিত্র একই সঙ্গে হয়ে উঠতে পারে স্মৃতি, ইতিহাস, সংবাদ, শিল্প এবং মানুষের অনুভূতির অমোচনীয় দলিল।
উল্লেখ্য, ১৮৩০ সালে লুই ডাগে সর্বপ্রথম ফটোগ্রাফিক প্রসেস আবিষ্কার করেন, যার নাম ‘ডাগেরোটাইপ’। দ্য ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ১৮৩৯ সালের ৯ জানুয়ারি সেই প্রসেসটি ঘোষণা করেন। এরপর ফরাসি সরকার ওই বছরেরই ১৯ আগস্ট দিন থেকে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে প্রত্যেক বছর এই দিনটি বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস হিসেবে উৎযাপন করে আসছে পুরো পৃথিবী।
১৮৩৭ সালে নাইসফোর নিপেক ও লুইস ডাগুয়েরে ডাগুয়েরিওটাইপ ফটোগ্রাফিক সিস্টেম আবিষ্কার করেন। এই উপায়ের নাম হল ডাগুয়েরিওটাইপ। বিজ্ঞানী লুইস ডাগুয়ের সর্বপ্রথম ছবি তোলার ব্যবহারিক এ উপায় আবিষ্কার করেন। তার নাম অনুসারেই ছবি তোলার এই উপায়ের নাম দেওয়া হয় ডাগুয়েরিওটাইপ টাইপ ফটোগ্রাফি। ১৮৩৯ সালের ১৯ আগস্ট ফরাসি সরকার এটিকে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই ফটোগ্রাফিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।



