৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

পঞ্চগড়-কক্সবাজার: ১০৭৭ কিলোমিটার রেল করিডোরে যুক্ত হবে দেশের দুই প্রান্ত

maxresdefault (1)

উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বের কক্সবাজার—দেশের দুই প্রান্তকে সরাসরি রেল যোগাযোগে যুক্ত করতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেল করিডোর গড়ে তুলতে পাঁচটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পগুলো শেষ হলে পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি নতুন ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, পাঁচ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কাজগুলো শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনেও বড় পরিবর্তন আসবে।

বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলের মাছ, লবণ ও শুঁটকি দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

যে পাঁচ প্রকল্পে তৈরি হবে সংযোগ

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি প্রকল্প হলো—সান্তাহার-বগুড়া, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ।

এর মধ্যে টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-দোহাজারী ও সান্তাহার-বগুড়া অংশে ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ চলছে। আর বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, বগুড়া-সিরাজগঞ্জে ১২ হাজার কোটি টাকা, লাকসাম-চট্টগ্রামে ১৫ হাজার কোটি টাকা, আখাউড়া-টঙ্গীতে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং সান্তাহার-বগুড়া রেলপথ উন্নয়নে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।

Advertisements

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন অনেকটাই দূর হবে।

ব্রডগেজে যুক্ত হবে উত্তর ও দক্ষিণ

রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে দেশে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববাজারে মিটারগেজের কোচ ও ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এ কারণে ধীরে ধীরে দেশের রেলপথকে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে দেশের রেলপথের বড় অংশ ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, পঞ্চগড় থেকে পার্বতীপুর হয়ে সান্তাহার পর্যন্ত বর্তমানে ডুয়েলগেজ লাইন রয়েছে। মিটারগেজের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ থাকলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ ব্রডগেজ সংযোগে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম অংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিসিং লিংক, বিশেষ করে টঙ্গী-আখাউড়া অংশ, উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশের প্রকল্পও পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।

কমবে দূরত্ব, বাড়বে পণ্য পরিবহন

সান্তাহার হয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রুট চালু হলে বর্তমান পথের তুলনায় প্রায় ১১৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছে। বর্তমানে টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরির কাজ চলছে এবং আগামী জানুয়ারিতে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।

সান্তাহার থেকে বগুড়ার কাহালু পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ করা হলে পঞ্চগড় থেকে সান্তাহার-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেন চলাচল প্রায় ১০ গুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণ, মাছ ও শুঁটকি উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

ঢাকাকে এড়িয়ে চলবে ট্রেন

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঢাকার ওপর চাপ কমানো। ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণের পর সেখান থেকে পূবাইলের দিকে সংযোগ লাইন তৈরি হলে অনেক ট্রেন ঢাকা স্টেশনে না ঢুকেই সরাসরি চট্টগ্রামের দিকে যেতে পারবে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে কিছু ট্রেনকে টঙ্গীতে গিয়ে ইঞ্জিন ঘোরাতে হয়। ধীরাশ্রম-পূবাইল সংযোগ চালু হলে সেই প্রয়োজনও থাকবে না।

তার মতে, পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাঁচ বছর বা তার কিছু বেশি সময় লাগতে পারে। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের ওপর প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সময় অনেকটাই নির্ভর করবে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল করিডোর চালু হলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত একটি সমন্বিত রেল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এতে যাত্রীসেবা ও রেলের আয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, পর্যটন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Advertisements