২০২৮ শিক্ষাক্রমে বড় বদলের প্রস্তুতি, অক্টোবরে শুরু হচ্ছে কাজ

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রয়োজনভিত্তিক সীমিত পরিমার্জনের পর ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে বিস্তৃত পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। চলতি বছরের অক্টোবর থেকেই বর্তমান শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নির্ধারণে প্রথমে বর্তমান শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিউ কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত বিষয়বস্তু ও শিখনফল কতটা অর্জন করতে পারছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষাক্রমের কোন অংশে সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজন প্রয়োজন, তাও চিহ্নিত করা হবে।
২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় বা বিষয়বস্তু পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী শিখনফল, শিক্ষণ-পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমান মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এই পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যা শিখছে, প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে তা কতটা যথাযথভাবে যাচাই করা যাচ্ছে এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। অংশীজনদের মতামত ও মূল্যায়নের ফল পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও মতামত নেওয়া হবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এদিকে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম নিয়ে বড় পরিসরে পর্যালোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে প্রয়োজনভিত্তিক বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন বইয়ে বিষয়বস্তু পরিমার্জনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি বই যুক্ত হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও খেলাধুলাবিষয়ক দুটি বই যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি বই। নতুন বইগুলোর ক্ষেত্রে প্রচলিত বার্ষিক পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের জীবন ও অবদান আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স সম্পর্কে বিষয়বস্তু যুক্ত করা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহও নতুন পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ রাখা হচ্ছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহও বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি শিক্ষাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বই নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিষয় যুক্ত করার পাশাপাশি ব্যবহারিক দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মওলা জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম নিয়ে কাজ শুরুর আগে বর্তমান শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন করা হবে। অক্টোবর থেকে এ মূল্যায়ন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বর্তমান শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী পরিবর্তনের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হবে।
এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম শওকত আলী খানও জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের উদ্যোগে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নয়, শিখনফল, শিক্ষণ-পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে।
তবে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম সংশোধনের আনুষ্ঠানিক কাজ এখনো শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন এ কার্যক্রমের সম্ভাব্য প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর মতে, কাজ শুরু হলে পরিকল্পনা ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।
ফলে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে প্রয়োজনভিত্তিক পরিবর্তনের পর ২০২৮ সালে শিক্ষাক্রমের আরও বড় পরিসরের পর্যালোচনা ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত পরিবর্তনের রূপরেখা নির্ধারণ হবে বর্তমান শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে।



