বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

হামের চিকিৎসায় ঘরবাড়ি-গয়না বিক্রি, নিঃস্ব দুই পরিবার

452a4f7c-5c76-4261-aed5-5a5f5072c018

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিচতলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন আট মাসের ইনাইয়া। প্রথমে জ্বর, এরপর হাম। পরে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি। প্রায় দুই মাস ধরে চলছে তার চিকিৎসা। মেয়েকে সুস্থ করতে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় ছুটে আসা পরিবারটি এরই মধ্যে চিকিৎসায় খরচ করেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। সেই খরচ জোগাতে ঘরবাড়ি ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে তাদের।

ইনাইয়ার নানি আছিয়া বেগম জানান, তাঁরা কৃষক পরিবার। নাতনির চিকিৎসার খরচ চালাতে নিজেদের সহায়-সম্বল বিক্রি করতে হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—আগামীর চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন।

গত ১৫ জুন অসুস্থ হওয়ার পর ইনাইয়াকে ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নয় দিন চিকিৎসার পাশাপাশি এক্স-রে ও বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। কিছুটা সুস্থ মনে হওয়ায় তাকে বাড়িতে নেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর আবার জ্বর আসে এবং শরীরে লালচে দাগ দেখা দেয়। পরে তাকে ফের হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর প্রথম দিকে হামের উপসর্গকে মশার কামড় হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল। পরে শিশুটির শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিল না। চিকিৎসক অক্সিজেন দেওয়ার পরামর্শের পাশাপাশি তাকে ঢাকায় নেওয়ার কথা বলেন।

গত ২৫ জুলাই ইনাইয়াকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। বেড, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বাড়তে থাকে প্রতিদিন। একপর্যায়ে তার পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হয়। কিন্তু শিশু হাসপাতালে তাৎক্ষণিক জায়গা না থাকায় সাত দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। শুধু সেখানেই খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা।

পরে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও ইনাইয়ার শারীরিক অবস্থা দেখে পরিবারটি রাজি হয়নি। আছিয়া বেগম বলেন, শিশুটির কান্নার শব্দ নেই, বুক এখনও অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। তাই সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বাড়ি নিতে চাননি তাঁরা। এরপর আবার তাকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

Advertisements

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু বেডের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে। কোনো কোনো দিন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আরও প্রায় ২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এরই মধ্যে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা।

ইনাইয়ার বাবা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর বৈধ আকামা না থাকায় নিজের খরচ চালানোও কঠিন। তারপরও সন্তানের চিকিৎসার জন্য যতটা সম্ভব টাকা পাঠাচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসা এখনও শেষ হয়নি। ফলে পরবর্তী খরচ কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে দিশেহারা পরিবারটি।

গয়না বিক্রি করে মেয়ের চিকিৎসা

একই ওয়ার্ডের ১৫ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন দুই বছরের মরিয়ম। পাঁচ দিন ধরে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লামিয়া বেগম। এরই মধ্যে চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা।

মরিয়মের বাবা এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। লামিয়া জানান, মেয়ের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি জন্মের পর থেকেই তার বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। নিয়মিত খিঁচুনি হয়, সে নিজে বসতে বা দাঁড়াতে পারে না, ঘাড় সোজা করে রাখতে পারে না এবং নিজে থেকে শরীরও উল্টাতে পারে না।

এর আগে মেয়ের চিকিৎসার জন্য দুইবার শিশু হাসপাতালে এসেছিলেন লামিয়া। কিন্তু বেড না পাওয়ায় ফিরে যেতে হয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারি হাসপাতালেও মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি।

জন্মের পর থেকেই অসুস্থ থাকায় মরিয়মকে হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়া হয়নি বলে জানান তার মা। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হাসপাতালে আসার আগে নিজের কানের সোনার গয়না বিক্রি করেন লামিয়া। সেখান থেকে পাওয়া ২৫ হাজার টাকা দিয়েই চলছে মেয়ের চিকিৎসা। তবে সেই টাকাও প্রায় শেষ।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী মরিয়মের আরও চিকিৎসা প্রয়োজন। কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে, তা জানা নেই মায়ের। তাই বিনা মূল্যে একটি শয্যার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

রোগীর চাপে হাসপাতালেও দুর্ভোগ

শিশু হাসপাতালে শুধু হামে আক্রান্ত রোগীরাই নয়, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদেরও ব্যাপক ভিড় দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের করিডোর, ভবনের বাইরে, গাছতলা ও ফটকের সামনে অপেক্ষা করছেন রোগী ও স্বজনরা।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, বসার জায়গা না পেয়ে অনেকে মেঝেতে বসে আছেন। কেউ অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। এক শিশুর মা জানান, জ্বর হলেই এখন আতঙ্ক তৈরি হয়—ডেঙ্গু বা হাম হয়েছে কি না, সেই আশঙ্কায় দ্রুত হাসপাতালে আসতে হচ্ছে।

বরিশাল থেকে ছয় বছরের আবু সাঈদকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার বাবা। শিশুটির নিউমোনিয়া হয়েছে এবং চিকিৎসক তাকে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে বেড খালি না থাকায় করিডোরেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবারটিকে।

হামের চিকিৎসায় বাড়ছে আর্থিক চাপ

হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও বাড়ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো পড়ছে বড় ধরনের আর্থিক চাপে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, হামের চিকিৎসার খরচ অনেক পরিবারের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হামের জন্য আলাদা জরুরি সেল এবং করোনাকালের মতো একটি জরুরি ফোন নম্বর চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার বহির্বিভাগে রোগী এসেছে ১ হাজার ২১৮ জন। ওই দিন হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৩ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯৮ জন। এ পর্যন্ত হাম নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ২৭৬ শিশু। মারা গেছে ২১ জন। এছাড়া হামের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি—এমন ৪৫০ শিশুও হাম আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো এবং সরকারি হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সূত্রঃ সমকাল

Advertisements
চিকিৎসাশিশুহাম