বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

গাজায় জীবিকার অবলম্বন হয়ে উঠেছে সাধারণ একটি লাইটার

গাজায় জীবিকার অবলম্বন হয়ে উঠেছে সাধারণ একটি লাইটার

গাজায় একটি সাধারণ লাইটার এখন শুধু আগুন ধরানোর উপকরণ নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি খাবার রান্না, রুটি বানানো, শিশুদের জন্য পানি গরম করা কিংবা এক কাপ চা তৈরির অপরিহার্য উপকরণ। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে রান্নার গ্যাস ও জ্বালানির সংকটের মধ্যে কাঠের চুলায় আগুন জ্বালাতে লাইটারের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। কিন্তু সেই লাইটারই এখন সেখানে দুর্লভ ও ব্যয়বহুল।

গাজা সিটির একটি তাঁবুর ভেতরে বসে নিজের পুরোনো লাইটারটি হাতে নিয়ে এভাবেই জীবনযাপনের গল্প বলছিলেন পাঁচ সন্তানের মা রাবাব দেইফাল্লাহ। ৪৬ বছর বয়সী এই নারী কাঠ পুড়িয়ে রুটি বানান, সন্তানদের জন্য পানি গরম করেন, রান্না করেন এবং চা তৈরি করেন।

রাবাব বলেন, ‘আমাদের পুরো দৈনন্দিন জীবনই আগুনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আগুন জ্বালানোর শুরুটা হয় একটি লাইটার দিয়ে। আর এই ছোট জিনিসটিই এখন গাজায় পাওয়া সবচেয়ে কঠিন জিনিসগুলোর একটি।’

যুদ্ধের আগে লাইটার ছিল খুবই সস্তা ও সহজলভ্য। রাবাবের স্মৃতিতে, তখন এক শেকেলে তিনটি লাইটার পাওয়া যেত। এখন একটি নতুন লাইটারের দাম ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত। পুরোনো লাইটারটি সচল রাখতে সর্বশেষ তাকে ১২ ডলার খরচ করে মেরামত করতে হয়েছে।
রাবাবের প্রশ্ন, ‘আমি কি এত টাকা একটি লাইটারের পেছনে খরচ করব, নাকি এক বস্তা ময়দা কিনব?’

খাবারের পেছনেই সীমিত অর্থ খরচ করতে চান গাজার পরিবারগুলো। তাই একটি লাইটার এখন একাধিক পরিবারের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হয়। কোনো দিন লাইটার না পেলে পরিবারগুলোকে ঠান্ডা খাবার খেয়ে থাকতে হয়। কখনো প্রতিবেশীর চুলায় আগুন জ্বললে সেখান থেকে আগুন ধার করে আনতে হয়।

রাবাব জানান, তিনি কখনো প্রতিবেশীর কাছে একটি কার্ডবোর্ডের টুকরা পাঠান। সেটিতে আগুন ধরিয়ে এনে নিজের চুলা জ্বালান। আবার কোনো প্রতিবেশী রুটি বানালে তার ওভেন ব্যবহার করে পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করেন।

Advertisements

লাইটার জ্বলে না, চুলাও জ্বলে না
জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মানসুরের অভিজ্ঞতাও একই। যুদ্ধের আগে তার স্বামী দর্জির কাজ করতেন। পরিবারটি তুলনামূলক স্বচ্ছলভাবে চললেও যুদ্ধের কারণে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় এখন ছয় সন্তানের ভরণপোষণে সহায়তা করতে হাসনা খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন।

তিনি একটি মাটির চুলা ব্যবহার করেন। কিন্তু নতুন লাইটার কেনার সামর্থ্য না থাকায় পুরোনোটিই বারবার মেরামত করে চালাতে হচ্ছে তাকে।

হাসনা বলেন, গ্যাস থাকলে ছোট একটি স্ফুলিঙ্গেই আগুন জ্বালানো যায়। কিন্তু মাটির চুলায় রান্নার জন্য প্রয়োজন ভালোভাবে আগুন জ্বলা।

একদিন সকাল থেকে চেষ্টা করেও বেলা ১০টা পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বালাতে পারেননি তিনি। পরে ছোট মেয়েকে হাতে কার্ডবোর্ডের টুকরা দিয়ে এমন কারও সন্ধানে পাঠান, যার চুলায় আগুন জ্বলছে। কিন্তু মেয়েটি আগুন জোগাড় করতে পারেনি।

লাইটার মেরামতও এখন পেশা
গাজায় পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ ও সীমান্তপথ বন্ধ থাকার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ ও সীমান্তপথ বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এবং দাম বেড়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কিছু সামগ্রী গাজায় ঢোকানোর অনুমোদন পেতেও অতিরিক্ত জটিলতার মুখে পড়তে হয়।

গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে গাজায় ৩০ হাজারের বেশি ট্রাক প্রবেশ করেছে। দৈনিক গড়ে তা ১৯১টির বেশি নয়। যুদ্ধের আগে গাজার প্রয়োজনের তুলনায় এই প্রবাহ ছিল অনেক কম।

লাইটারও এমন একটি পণ্য, যার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পুরোনো লাইটার ফেলে দিয়ে নতুনটি কেনার বদলে মেরামতের প্রবণতা বেড়েছে। এমনকি লাইটার মেরামত করাও এখন গাজায় নতুন এক ধরনের পেশায় পরিণত হয়েছে।

গাজা সিটির পশ্চিমে আল-কারমেল স্কুলের কাছে ছোট একটি স্টল বসিয়ে লাইটার মেরামত করেন ২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাওয়িশ। যুদ্ধের আগে তিনি গাড়ি চালাতেন। এখন দুই সন্তানের এই বাবা লাইটার মেরামত করে পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন।

তামের বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের এমন সব কাজ ও পেশায় যেতে বাধ্য করেছে, যেগুলোর কথা আমরা আগে কখনো ভাবিনি। পরিবারকে চালানোর জন্যই আমি লাইটার মেরামত শুরু করেছি।’

তিনি জানান, যুদ্ধের আগে লাইটার মেরামতের প্রয়োজনই হতো না। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে মানুষ পুরোনো লাইটার ফেলে নতুনটি কিনত। এখন পণ্যের দাম ও সংকটের কারণে মানুষ পুরোনো লাইটারই মেরামত করে ব্যবহার করতে চায়।

নষ্ট লাইটার থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্য লাইটারে ব্যবহার করেন তামের। তার ভাষায়, ‘এখন পুরোনো একটি লাইটারেরও মূল্য আছে। নষ্ট লাইটার থেকে যন্ত্রাংশ নিয়ে অন্য লাইটার মেরামত করি, যাতে সেটি আরও কিছুদিন চলে।’

একটি লাইটার, অনেক পরিবার
বাস্তুচ্যুত শাদি আবু শামলাহ তার পরিবারের সঙ্গে গাজা সিটির পশ্চিমে আল-কারমেল স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে লাইটারের সংকট কতটা তীব্র, তা বোঝাতে তিনি বলেন, পুরো স্কুল এলাকায় চারটির বেশি লাইটার পাওয়া যাবে না।

সেই অল্প কয়েকটি লাইটারই এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে ঘুরে বেড়ায়। কখনো রান্নার জন্য, কখনো পানি গরম করতে, আবার কখনো শিশুর জন্য দুধ বা পরিবারের জন্য এক কাপ গরম চা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

শাদি বলেন, ‘আজ লাইটারই জীবনের মেরুদণ্ড। আপনার তাঁবুতে যদি একটি লাইটার থাকে, তাহলে আপনি ঠিক আছেন। না থাকলে আপনি আটকে গেলেন।’

লাইটারের অভাবে কখনো কখনো তার পরিবার রাতের খাবারও খেতে পারে না। একটি লাইটারের ছোট্ট ফ্লিন্ট বা স্ফুলিঙ্গ তৈরির অংশ কিনতেও এখন ২৫ থেকে ৩০ শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ৮ থেকে ১০ ডলার লাগে।

লাইটারে গ্যাস ভরার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে মানুষকে। বড় গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছোট লাইটারে গ্যাস ভরার চেষ্টা করতে গিয়ে কেউ কেউ দগ্ধ হচ্ছেন।

সূত্র: আল-জাজিরা

Advertisements
গাজাজীবিকালাইটার