লন্ডনে মেট্রোরেল অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়ের

লন্ডনের ব্যস্ত রেলপথে প্রতিদিন ছুটে চলে অসংখ্য ট্রেন। সেই ট্রেনের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়ের। একসময় তিনি নিজেই ছিলেন ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়ের (ডিএলআর) প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট (পিএসএ)। এখন সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়ে তৈরি করছেন নতুন প্রজন্মের ট্রেন অপারেটর।
মারওয়ার জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। বাবা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। তাঁর দাদাবাড়ি বাংলাদেশের সিলেটের গোলাপগঞ্জে। ব্রিটেনে বেড়ে উঠলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গভীর। সাবলীল বাংলায় কথা বলেন, গিটার বাজান এবং পছন্দের বাংলা গানও করেন।
তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো লন্ডনের রেলওয়েতে দীর্ঘ কর্মজীবন।
ব্যাংক থেকে রেলওয়েতে
কর্মজীবনের শুরু রেলওয়েতে নয়। ২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কাজ করতেন মারওয়া। এর আগে ওষুধের দোকান ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকের চাকরিতেই স্থির হওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব ব্যাংকিং খাতেও পড়ে। চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন পেশার কথা ভাবতে শুরু করেন তিনি। তখন ডিএলআরে কর্মরত এক বন্ধু তাঁকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন।
ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা তাঁকে আকৃষ্ট করে। আবেদন করেন ডিএলআরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট পদে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণ। এরপর আরও দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন। লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা পেরিয়ে অর্জন করতে হয় ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স। ২০১১ সালে ডিএলআরের ট্রেন অপারেটর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবন শুরু করেন মারওয়া।
‘এটা মেয়েদের কাজ নয়’
রেলওয়েতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি পরিবারের সবাই সহজভাবে মেনে নেননি। পরিবারের ধারণা ছিল, ট্রেন চালানো কিংবা রেলওয়ের কাজ মূলত পুরুষদের জন্য।
কিন্তু মারওয়া থামেননি। সময়ের সঙ্গে পরিবারের সেই মনোভাব বদলে যায়। আজ তাঁরাই তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক।
আর কর্মজীবনের মাত্র এক বছর পরই আসে বড় এক স্বীকৃতি।
প্যারালিম্পিক মশাল ও পরিচিত কণ্ঠ
২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিকের মশাল বহন করে স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া বিশেষ ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে নির্বাচিত হন মারওয়া।
অনেক পিএসএর মধ্য থেকে তাঁকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তাঁর ঘোষণা দেওয়ার ধরন। পরিষ্কার ও স্বাভাবিক কণ্ঠের জন্য তাঁর ঘোষণা তত দিনে ডিএলআরের যাত্রীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
সেই বিশেষ যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। মারওয়ার কণ্ঠও হয়ে ওঠে আয়োজনটির একটি অংশ। তাঁর সেই কণ্ঠ আজও ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়। অপারেটরদের জন্য তৈরি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি ও নির্দেশনা তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় ট্রেন, কখনো ম্যানুয়াল চালনা
ডিএলআরের ট্রেন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় চলে। তবে মারওয়ার কর্মজীবনের শুরুর দিকে সিগন্যালিং ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে তাঁকে অনেকবার ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে।
কখনো দিনে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়াল মোডে যেতে হয়েছে। পরে অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
ম্যানুয়ালি ট্রেন চালানোর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাত্রী সামলানো। ডিএলআরের ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কেবিন না থাকায় যাত্রীরা সরাসরি অপারেটরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় চালকের পুরো মনোযোগ সামনের দিকে রাখতে হয়।
তাই আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানানো হতো যে ট্রেনটি ধীরগতিতে চলবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। অনেক যাত্রী তবু প্রশ্ন করতেন, ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন। কিন্তু মারওয়ার কাছে যেকোনো পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তাই ছিল প্রথম।
রেলওয়ের কাজে কখনো কখনো আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ট্রেনের সামনে কেউ ঝাঁপ দিলে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো দায়িত্বও অপারেটরকে পালন করতে হয়। এমন ঘটনার পর কয়েকজন সহকর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দায়িত্ব থেকে সরেও গিয়েছিলেন। পরে মারওয়াকে গিয়ে ট্রেন সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।
অপারেটর থেকে প্রশিক্ষক
প্রায় চার বছর ট্রেন চালানোর পর মারওয়ার কর্মজীবনে আসে নতুন অধ্যায়। এবার তিনি অপারেটরদের প্রশিক্ষক।
নতুন দায়িত্বে তাঁকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। বিশেষ করে বয়স ও নারী হওয়ার কারণে নিজের নেতৃত্বের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে কখনো সরাসরি বিরোধিতার মুখেও পড়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু একজন নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন তাঁকে জানিয়েছিলেন, কোনো নারী তাঁকে কী করতে হবে তা বলুক, তিনি তা চান না।
অভিজ্ঞতাগুলো কষ্ট দিলেও তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। শিখেছেন কোথায় সীমারেখা টানতে হয় এবং কীভাবে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়।
বর্তমানে মারওয়া ডিএলআরের একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। তাঁর দাবি, তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
সিলেটের শিকড়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন
সিলেটের গোলাপগঞ্জের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক এখনো অটুট। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে আসেন। তবে দেশের মেট্রোরেলে এখনো চড়া হয়নি—এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়েছে।
চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া তাঁর সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদানকে বিশেষভাবে মনে করেন। তাঁরা ছেলে-মেয়ের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান ও বাদ্যযন্ত্রের মতো বিষয়েও আগ্রহী হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
এখন মারওয়ার স্বপ্ন, নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা যেন পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধ না করে। ডাক্তার বা শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রেও যে তাঁদের জন্য সমান সুযোগ রয়েছে, সেটি তাঁরা বুঝুক।
একসময় যে কাজকে তাঁর পরিবার ‘মেয়েদের কাজ নয়’ বলে মনে করেছিল, আজ সেই রেলপথেই মারওয়া অন্যদের পথ দেখাচ্ছেন। তাঁর গল্প তাই শুধু সাফল্যের নয়—নিজের জন্য পথ তৈরি করে অন্য নারীদের সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেওয়ারও গল্প।



