৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

নারীদের নিরাপদ যাতায়ানে নতুন উদ্যোগ ‘মায়া রাইড’

social-1777190671684-1000077520

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে চলাচল করেন অসংখ্য নারী। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ব্যবসায়িক কাজে বের হলেও গণপরিবহনে ভিড়, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও যৌন হয়রানির আশঙ্কা অনেকের যাত্রাকে অস্বস্তিকর করে তোলে। একই ধরনের নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রশ্ন থাকে সিএনজি কিংবা পুরুষ চালকের রাইড-শেয়ারিং বাইকে ওঠার ক্ষেত্রেও।

নারীদের এমন অভিজ্ঞতা থেকেই নারী চালকের মাধ্যমে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য রাইড-শেয়ারিংয়ের চিন্তা আসে জান্নাতুল ফেরদৌসের মাথায়। স্বামী ফাহাদ চৌধূরীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার পর তারা উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর চালু হয় ‘মায়া রাইড’—নারীদের জন্য তৈরি একটি বিশেষ রাইড প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নারী চালকরাই নারী যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন।

ফাহাদ চৌধূরী ডেটা মার্কেটিংয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তার ভাষ্য, শুরুতে এটি ছিল অনেকটা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

চার মাসে ৭০ নারী রাইডার

২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি ‘মায়া রাইড’-এর ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ চালু করা হয়। শুরুতে চারজন নারী বাইক রাইডার যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে আগ্রহী চালকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রায় চার মাসের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত হন প্রায় ৭০ জন নারী বাইক রাইডার। তাদের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০ জন নিয়মিত রাইড দিচ্ছেন।

শুধু বাইক নয়, ব্যক্তিগত গাড়ি থাকা নারীরাও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ২৫ জন নারী কার চালক মায়া রাইডের সঙ্গে আছেন। তাদের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছেন।

শুরুতে ঢাকায় উবার ও পাঠাওয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নতুন প্ল্যাটফর্মটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংশয় ছিল। কিন্তু যাত্রী ও রাইডারদের সাড়া তাদের সেই ধারণা বদলে দেয়। মাত্র চার মাসেই ৩০০টির বেশি বাইক রাইড সম্পন্ন হয়েছে। কোনো কোনো গ্রাহক ২২ বারের বেশি, আবার কেউ ৩০ বারেরও বেশি এই সেবা নিয়েছেন।

Advertisements

‘চিন্তাহীন যাতায়াত করতে পারি’

মায়া রাইডের নিয়মিত গ্রাহকদের একজন নুঝাত তাবাসসুম। ঢাকার শ্যামলী থেকে নিয়মিত গুলশান-১ এলাকায় অফিসে যাতায়াত করেন তিনি। নিজের গাড়ি থাকলেও সবসময় সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। গণপরিবহন, সিএনজি কিংবা প্রচলিত রাইড-শেয়ারিং ব্যবহার করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় ভোগান্তির মুখেও পড়েছেন তিনি।

এক সহকর্মীর কাছ থেকে মায়া রাইড সম্পর্কে জানার পর প্রথমবার সেবা নেন নুঝাত। অভিজ্ঞতা ভালো হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি ৩০ বারেরও বেশি এই সেবা ব্যবহার করেছেন। তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, রাইডারের আসনে একজন নারী থাকায় যাত্রাপথে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য দুটোই অনুভব করেন।

নুঝাতের মতে, অন্য রাইড-শেয়ারিং সেবার তুলনায় মায়া রাইডের খরচ কিছুটা বেশি হলেও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত খরচটুকু তার কাছে গ্রহণযোগ্য।

ভাড়া বেশি হওয়ার কারণ

মায়া রাইডের উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌসও স্বীকার করেন, অন্যান্য রাইড-শেয়ারিং সেবার তুলনায় তাদের ভাড়া কিছুটা বেশি। এর অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী চালক এখনো তাদের প্ল্যাটফর্মে নেই। ফলে অনেক সময় একজন রাইডারকে যাত্রী নেওয়ার জন্য দূরের এলাকা থেকে আসতে হয় কিংবা ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে যেতে হয়।

ভবিষ্যতে চালকের সংখ্যা বাড়িয়ে ভাড়া কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। একই সঙ্গে এতে আরও বেশি নারী যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

চালক যুক্ত করার আগে যাচাই

নারী যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু তথ্য যাচাই করে মায়া রাইড। আগ্রহী চালকদের ওয়েবসাইটে আবেদন করতে হয়। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছবি, গাড়ি বা বাইকের নম্বর এবং যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

নতুন লাইসেন্সধারী বা অল্প অভিজ্ঞ চালকদের সহজে অনুমোদন দেওয়া হয় না। অন্তত এক থেকে দুই বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা থাকা চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

কার সার্ভিসে দুই ধরনের প্যাকেজ

বাইকে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না—এমন নারী যাত্রীদের জন্য মায়া রাইডে চালু করা হয়েছে কার সার্ভিস। এটি সাপ্তাহিক ও মাসিক সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক। একই গাড়িতে একজন অথবা তিন থেকে চারজন নারী যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন।

কার সার্ভিসে রয়েছে দুটি প্যাকেজ—‘পিক আপ পয়েন্ট’ ও ‘ডোর টু ডোর’। পিক আপ পয়েন্ট প্যাকেজের মাসিক খরচ প্রায় ৭ হাজার ৩০০ টাকা। আর ডোর টু ডোর প্যাকেজের জন্য দিতে হয় প্রায় ৯ হাজার ২০০ টাকা। ঢাকা সিটির ভেতরে যেকোনো এলাকা থেকে সেবা নিলেও প্যাকেজের মূল্য একই থাকে।

পিক আপ পয়েন্ট ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সুবিধাজনক স্থান থেকে যাত্রীদের তোলা হয়। অন্যদিকে ডোর টু ডোর সেবায় যাত্রীকে বাসার সামনে থেকে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।

প্রি-বুকিংয়ের মাধ্যমে সেবা

মায়া রাইডের অধিকাংশ সেবাই আগাম বুকিংয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে কার সার্ভিস নিতে হলে কয়েক দিন আগে বুকিং করতে হয়, কারণ বর্তমানে পর্যাপ্ত সংখ্যক কার চালক নেই।

বাইক রাইডের ক্ষেত্রে আগের দিন রাত ১০টার মধ্যে বুকিং করলে নির্ধারিত সময়ে রাইডার পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যাত্রীর অনুরোধ রাইডারদের গ্রুপে জানানো হয়। আগ্রহী রাইডার সাড়া দিলে তাকে নির্ধারণ করা হয় এবং পরে যাত্রী ও রাইডার—দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করা হয়।

বাইক রাইডের জন্য কোনো সাপ্তাহিক বা মাসিক প্যাকেজ নেই। যাত্রা শেষে যাত্রী সরাসরি রাইডারকে ভাড়া পরিশোধ করেন। তবে যাত্রার আগেই ভাড়ার পরিমাণ জানা যায়। ওয়েবসাইটের ক্যালকুলেটরে যাত্রার স্থান দিলে দূরত্ব অনুযায়ী সম্ভাব্য ভাড়াও দেখা যায়।

শিশুদের জন্য ‘মায়া কিডস’

নারীদের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টিও এখন গুরুত্ব দিচ্ছে মায়া রাইড। কর্মব্যস্ত বাবা-মায়ের কথা মাথায় রেখে চালু করা হয়েছে ‘মায়া কিডস’ নামের পরিবহন সেবা। এর মাধ্যমে শিশুদের বাসা থেকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল শেষে নিরাপদে বাসায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

এই সেবাটিও প্রি-বুকিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রয়োজনে শিশুর পরিবারের একজন সদস্যও তার সঙ্গে যেতে পারেন। বর্তমানে মায়া কিডসের প্রায় সাতজন গ্রাহক রয়েছেন।

নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ

উদ্যোক্তাদের পথচলা অবশ্য সবসময় সহজ ছিল না। চালকের সংকট, মাঝপথে কারও কাজ ছেড়ে দেওয়া এবং নারী রাইডারদের নিয়ে সামাজিক বিদ্রূপ—বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। অনেক নারী শুরুতে আগ্রহ দেখালেও সামাজিক কটূক্তির কারণে পিছিয়ে যেতে চেয়েছেন।

তবে উদ্যোক্তারা তাদের উৎসাহ দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে মায়া রাইডে যুক্ত চালকদের কাছ থেকে তাদের আয়ের ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়।

ফাহাদ ও জান্নাতের লক্ষ্য শুধু নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা নয়; এর পাশাপাশি নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। যেসব নারীর নিজেদের গাড়ি বা বাইক রয়েছে, তারা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সামনে অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা

বর্তমানে ওয়েবসাইটনির্ভরভাবে মায়া রাইডের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সেবাটিকে আরও সহজ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে একটি অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। সেখানে যাত্রী ও রাইডারদের আলাদা তথ্য, রাইডের ইতিহাসসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্যোক্তা ফাহাদ চৌধূরী জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে অ্যাপটি চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। অ্যাপ চালু হলে গ্রাহক ও রাইডার—উভয়ের জন্যই সেবাটি আরও সহজ ও গোছানো হবে।

সূত্র: টিবিএস

Advertisements