৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

হাইয়ের সংক্রমণ! অন্যের হাই দেখে নিজেরও হাই আসে যে কারণে

images (14)

কেউ আপনার সামনে হাই তুললেন। বিষয়টি হয়তো আপনি খেয়ালই করেননি। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ নিজের মধ্যেও হাই তোলার প্রবণতা অনুভব করলেন। কখনো আবার কারও হাই তোলার কথা শুনে, এমনকি এ নিয়ে পড়তে বা ভাবতে গিয়েও নিজের হাই চলে আসে।

মানুষের এই অদ্ভুত আচরণকে বিজ্ঞানে বলা হয় ‘সংক্রামক হাই’ (Contagious Yawning)। অর্থাৎ একজনের হাই অন্যজনের মধ্যেও একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিষয়টি বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কারণ হলেও, কেন এমন হয়—তার একক ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

তবে গবেষণায় হাই তোলা ও অন্যের হাই অনুকরণ করার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রম, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণের মতো বেশ কিছু বিষয়কে যুক্ত করা হয়েছে।

হাই তোলা কি শুধু ঘুম পাওয়ার লক্ষণ?

সাধারণভাবে ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি বা বিরক্তির সঙ্গে হাই তোলাকে আমরা মিলিয়ে দেখি। কিন্তু হাই তোলার ঘটনা শুধু এসব পরিস্থিতিতেই ঘটে না। ঘুম থেকে ওঠার সময়, ঘুমানোর আগে কিংবা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকলেও মানুষের হাই আসতে পারে।

একসময় ধারণা করা হতো, শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে সেটি পূরণ করার জন্য মানুষ হাই তোলে। কিন্তু পরবর্তী বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ব্যাখ্যার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করলেই হাই তোলার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় না। একইভাবে শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়লেও হাই তোলার হার প্রত্যাশিতভাবে বাড়ে না। এমনকি শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলেও হাই তোলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

Advertisements

ফলে শুধু অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণের জন্য মানুষ হাই তোলে—এই পুরোনো ধারণাটি এখন আর যথেষ্ট বলে মনে করা হয় না।

মস্তিষ্কের তাপমাত্রার সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে?

হাই তোলার কারণ ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা আরও কিছু তত্ত্ব সামনে এনেছেন। এর মধ্যে একটি হলো মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা।

কিছু গবেষণায় পরিবেশের তাপমাত্রা এবং হাই তোলার প্রবণতার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা করা হয়, হাই তোলা হয়তো মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটিকেও এখনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে ধরা যায় না। হাই তোলার পেছনে একাধিক শারীরবৃত্তীয় ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করতে পারে বলে মনে করা হয়।

তাহলে অন্যের হাই দেখে নিজের হাই আসে কীভাবে?

এখানেই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

আমরা যখন অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখি, তখন মস্তিষ্ক সেই আচরণটি খুব দ্রুত শনাক্ত করে। এরপর অনেক সময় কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত ছাড়াই নিজের শরীরেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

এটি অনেকটা মানুষের স্বাভাবিক অনুকরণপ্রবণতার মতো। অন্য কেউ হাসলে নিজেরও হাসি পেতে পারে, কারও মুখের অভিব্যক্তি দেখে নিজের মুখের ভাব বদলে যেতে পারে। সংক্রামক হাইও সামাজিক আচরণ অনুকরণের এমন একটি উদাহরণ হতে পারে।

শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, শিম্পাঞ্জির মতো কিছু সামাজিক প্রাণীর মধ্যেও অন্যের হাই অনুসরণ করার আচরণ দেখা গেছে।

পরিচিত মানুষের হাই কি বেশি ‘সংক্রামক’?

এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গবেষণায় বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য পাওয়া গেছে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অপরিচিত কারও তুলনায় কাছের মানুষ—যেমন পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর—হাই দেখলে তুলনামূলকভাবে বেশি হাই তুলতে পারে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় সামাজিক ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে সংক্রামক হাইয়ের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, পরিচিত মানুষের আচরণের প্রতি আমাদের মনোযোগ ও আবেগগত প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলে ঘনিষ্ঠ কারও হাই আমাদের মস্তিষ্কে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

তবে বিষয়টি নিয়ে সব গবেষণার ফল একই নয়। পরবর্তী কিছু গবেষণায় সংক্রামক হাই এবং সহানুভূতির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

অর্থাৎ, কেউ আপনার হাই দেখে হাই তুললেই তিনি আপনার প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

হাই দেখার সময় কোথায় তাকিয়ে আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

অন্যের হাই দেখে নিজের হাই আসার ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, মনোযোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কেউ হাই তুললেও আপনি যদি তার মুখের দিকে তাকিয়ে না থাকেন, তাহলে তার আচরণটি আপনার মস্তিষ্কে একইভাবে ধরা নাও পড়তে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মুখের দিকে মনোযোগ দেওয়ার মাত্রা সংক্রামক হাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ কারণেই শিশুদের এবং অটিজম স্পেকট্রামের ব্যক্তিদের নিয়ে করা গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করার সময় শুধু তারা হাই অনুকরণ করছে কি না, সেটি দেখলেই হয় না। তারা অন্য ব্যক্তির মুখের দিকে কতটা মনোযোগ দিচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে কি এই প্রবণতা তৈরি হয়?

সংক্রামক হাই জন্মের পর থেকেই মানুষের মধ্যে একই মাত্রায় দেখা যায় না। শিশুদের নিয়ে করা গবেষণায় বয়স বাড়ার সঙ্গে অন্যের হাই অনুকরণ করার প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

১ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪ বছর বয়সের দিকে অন্যের হাই দেখে হাই তোলার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হতে শুরু করে।

এ থেকে ধারণা করা হয়, সংক্রামক হাইয়ের সঙ্গে সামাজিক উপলব্ধি ও অন্যের আচরণের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার মতো দক্ষতার বিকাশের সম্পর্ক থাকতে পারে।

তাহলে কি হাই তোলা মানেই সহানুভূতির পরিচয়?

এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখছে না।

কিছু গবেষণায় সামাজিক ঘনিষ্ঠতা ও সংক্রামক হাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, অন্য গবেষণায় সেই সম্পর্ক খুব শক্তিশালীভাবে পাওয়া যায়নি। মানুষের মনোযোগ, পরিস্থিতি, পরিচিতি এবং আচরণ পর্যবেক্ষণের মাত্রার মতো বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই কারও হাই দেখে হাই তুলে ফেলাকে সরাসরি তার ব্যক্তিত্ব বা সহানুভূতির মাত্রার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।

কেন শুধু হাইয়ের কথা শুনেও হাই আসে?

এখানেই সংক্রামক হাইয়ের আরেকটি মজার দিক রয়েছে। অনেক সময় সামনে কাউকে হাই তুলতে না দেখেও শুধু হাইয়ের কথা শুনলে বা এ নিয়ে পড়লে নিজের মধ্যেও হাই তোলার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

এর পেছনে মস্তিষ্কের আচরণ শনাক্ত ও অনুকরণ করার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে ঠিক কোন স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় এই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

শেষ পর্যন্ত রহস্যটা কোথায়?

অন্যের হাই দেখে নিজের হাই আসা যে বাস্তব একটি মানবিক আচরণ, সেটি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। সামাজিক সম্পর্ক, মনোযোগ, আচরণ অনুকরণ এবং মস্তিষ্কের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া—সবকিছুর সঙ্গেই এর কোনো না কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।

কিন্তু হাই তোলার মূল উদ্দেশ্য কী এবং কেন একজনের হাই অন্যজনের মধ্যে একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—এই দুই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।

তাই পরেরবার আপনার পাশে কেউ হাই তুললে নিজের হাই চলে এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি শুধু ঘুম পাওয়ার লক্ষণ নাও হতে পারে; মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে অন্যের আচরণ লক্ষ্য করে এবং তার সঙ্গে নিজের আচরণকে সামঞ্জস্য করে, তারও একটি মজার উদাহরণ হতে পারে।

Advertisements