মা-বাবা হারিয়েও থামেনি তাসফিয়া, ১০ বছর পর স্কুলে একমাত্র জিপিএ-৫

অভাব-অনটন, স্বজন হারানোর বেদনা আর নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসফিয়া আক্তার। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে চাচার আশ্রয়ে বড় হওয়া তাসফিয়ার এই সাফল্যে দীর্ঘ ১০ বছর পর বিদ্যালয়টির জিপিএ-৫ না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচেছে।
ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারিয়ে অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়ে তাসফিয়া। এরপর দরিদ্র চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াছ উদ্দিনের সংসারেই তার আশ্রয় হয়। সীমিত আয়ে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ চালানোই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে তাসফিয়ার পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাওয়া ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাইভেট পড়ার সুযোগ ছিল না, ভালো গাইড বই কেনাও সম্ভব হতো না। এমনকি অনেক সময় পরীক্ষার ফি জোগাড় করতেও তাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাসফিয়ার পড়াশোনা ও স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
চাচার সহযোগিতা ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যায় তাসফিয়া। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ ও নিজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে।
হাতিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে গত এক দশকে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি। দীর্ঘ ১০ বছর পর তাসফিয়ার হাত ধরে বিদ্যালয়টিতে আবারও জিপিএ-৫ আসায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই ফলাফল বিদ্যালয়ের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র দাস বলেন, তাসফিয়ার অদম্য স্পৃহা ও পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠা সবাইকে মুগ্ধ করেছে। নানা বাধা অতিক্রম করে সে যে ফলাফল অর্জন করেছে, তা বিদ্যালয়ের সুনাম বাড়িয়েছে। তার এই সাফল্য ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
তাসফিয়ার সাফল্যের খবর পেয়ে তাকে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ডেকে নেন ইউএনও রাসেল ইকবাল। সেখানে তাকে কলেজে ভর্তি ও পোশাক কেনার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সরকারের অনগ্রসর শিক্ষাবৃত্তির আওতায় তাকে সহযোগিতা করার ব্যবস্থা, বিনা মূল্যে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই সরবরাহ এবং আগামী দুই বছর অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের গত ১০ বছরের ইতিহাসে তাসফিয়াই প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তার এই সাফল্য মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। তাসফিয়া যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য উপজেলা প্রশাসন সব সময় তার পাশে থাকবে।
তাসফিয়ার স্বপ্ন ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া। নিজের সাফল্যের পেছনে চাচার অবদান এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার কথা উল্লেখ করে তাসফিয়া জানায়, ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারানোর পর চাচাই তাকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাই তাকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তাদের সহযোগিতা ও নিজের পরিশ্রমের ফলেই আজ সে এই সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে।



